ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জামায়াতের ইশতেহার

ভোট টানতে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা

এফ এ শাহেদ
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম
রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আকাক্সক্ষা পূরণে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পাঁচ বছরের জন্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট দেবে জনগণ। সাধারণ ভোটাররা আশা করছেন উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার। জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করছে, যার ধারাবাহিকতায় নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে বলে জানিয়েছে দলটি। পুরো ইশতেহারকে আট ভাগে ভাগ করেছে দলটি। সরকারি চাকরিতে বিনা মূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, বৈষম্য দূরীকরণসহ সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তার যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে দলটি, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তবে তারা বলছেন, ইশতেহারের বেশির ভাগ বিষয় এমনকি যেগুলোতে দলটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তা ভোটারদের আকৃষ্ট করতে উচ্চাভিলাষী ইশতেহার, বাস্তবসম্মত নয়।

মাতৃত্বকালীন ছুটি না বাড়িয়ে কর্মঘণ্টা কমানো বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে পরিবেশগত অবক্ষয়, বর্জ্য ও বন্যার ঝুঁকিশূন্য ‘থ্রি জিরো ভিশন’ বাস্তবায়নের জন্য যে বিশাল সামাজিক-আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োজন, তা নেই। সুতরাং এগুলো শুধু ভোটের আশ্বাস বলেও মনে করছেন তারা। তারা মনে করেন, ইশতেহার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, একটি দলের রাষ্ট্রচিন্তা, নীতি ও শাসন দর্শনের লিখিত দলিল।

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে বলে জানিয়েছে দলটি। ইশতেহারে অগ্রাধিকার পেয়েছেÑ আপসহীন বাংলাদেশ গঠন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ, যুবকদের ক্ষমতায়ন, নারীদের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিচার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সবুজ-পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ইশতেহারের আটটি ভাগ রয়েছেÑ জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষায় বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ, আত্মনির্ভরতার পথে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, টেকসই অর্থনীতি উন্নয়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান, স্বনির্ভর কৃষি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন, সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যুবকদের নেতৃত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ইশতেহারের বিষয়ে বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, ডলারের সংকট এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন, যা অদূর ভবিষ্যতে আরও জটিল হতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় আগামীতে দলটি সরকার গঠন করলে টেকসই কী পরিকল্পনা থাকতে পারত, সে বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। তারা মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনি ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়। এটি একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রচিন্তা, নীতি-আদর্শ ও শাসনদর্শনের লিখিত দলিল।

ইশতেহারের মাধ্যমেই ভোটাররা জানতে পারেন ক্ষমতায় গেলে একটি দল কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেবে এবং কোন পথে সমাধান খুঁজবে। অথচ বাংলাদেশের নির্বাচনি বাস্তবতায় ইশতেহার প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হয়ে ওঠে, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তার মতো মৌলিক ও স্পর্শকাতর বিষয় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পরপরই রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করে। তারা বলে, বর্তমানে জ¦ালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানিনির্ভর।

এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সহজেই অনুমেয়। একই সঙ্গে গ্যাস খাতের দিকে তাকালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কম নয়। কিন্তু দৈনিক গড় গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার প্রায় ৫৯ থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত কোনো দলের পক্ষ থেকেই ইশতেহারে এখনো আসেনি, যা হতাশাজনক।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতের ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবেশগত অবক্ষয়, বর্জ্য ও বন্যার ঝুঁকিশূন্য এই ‘থ্রি জিরো ভিশন’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এটি একটি বিশাল কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে যে আর্থিক-সমাজিক অবকাঠামো প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনই সম্ভব নয়।

তবে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রূপালী বাংলাদেশেকে বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার বাস্তবায়নযোগ্য। দেশ ও মানুষের উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে তা বাস্তবায়নের ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে ক্ষমতায় যারা ছিলেন তারা বলেছিলেন, ধারাবাহিকতা থাকলে উন্নয়ন হয়। কিন্তু দেখা গেছে এর বিপরীত। আর তাই দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে। তিনি বলেন, কার্ড তুলে না দিয়ে কাজ তুলে দিতে চাই আমরা। আমরা এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেব না, যা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

 বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত, বৈষম্যমূলক আইন ও নীতিমালা দ্রুত সংস্কারÑ এগুলো কোনো রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলে তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় দলটি কেমন পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে মানুষের ধারণা স্পষ্ট নয় বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, যেসব দল নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে, সে কৌশলটা অনেক পুরোনো। তবে সেই প্রতিশ্রুতি নিশ্চিতে যে অর্থের জোগন এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শাসনব্যবস্থাসহ সব প্রতিশ্রুতি পালনে মনোযোগী হয়ে ওঠে না। আমরা আশাবাদী, রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে মনোযোগী হবে। তবে টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গঠন, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিতকরণসহ কৃষিতে বিপ্লব ইশতেহারে অগ্রাধিকার দিয়েছেন দলটি।

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো বাস্তবসম্মত নয় জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মাতৃত্বকালীন যে ছুটি ছয় মাস আছে, তা বাড়িয়ে এক বছর করতে পারত। তবে চাকরিতে তিন ঘণ্টা কমানো এটি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তারা ইশতেহারে অনেক বাস্তবসম্মত বিষয়ে দৃষ্টি দিয়েছেন। টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গঠন, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিতকরণ, কৃষিতে বিপ্লব সাধন, ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘থ্রি জিরো ভিশন’ বাস্তবায়নকেও ইশতেহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেটি চেষ্টা করলে খুব কম সময়েই করা সম্ভব।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, রাষ্ট্রের যে কাঠামোগুলো জড়িত, সেগুলো একসঙ্গে কাজ করাতে সক্ষম হবে কি না। তিনি বলেন, একটি ইশতেহার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, একটি দলের রাষ্ট্রচিন্তা, নীতি ও শাসনদর্শনের লিখিত দলিল, যার মাধ্যমে ভোটাররা জানতে পারেনÑ ক্ষমতায় গেলে একটি দল কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেবে এবং কোন পথে সমাধান খুঁজবে। তবে দেশের নির্বাচনি বাস্তবতায় ইশতেহার প্রায়ই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হয়ে ওঠে। যদি তাদের কথা রাখেন, তবেই ফল আসা সম্ভব।

এদিকে, ইশতেহারকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে নয়, জাতির প্রতি জীবন্ত দলিল হিসেবে দেখার আহ্বান জানান দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এটি জনগণের কাছে জীবন্ত দলিল হিসেবে থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলো সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও অঙ্গীকার থেকেই ইশতেহার দিয়ে থাকে।

যদিও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি দলটি। নারী, শিশু ও পরিবারের উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতিতে দলটি বলেছে, পরিবার কাউন্সেলিং ও মোটিভেশন সেন্টার চালু করা, নিরাপদ বিদ্যালয় কর্মসূচি ও মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অনুদান ও সেবার পরিসর বাড়ানো। রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে (আসন ও ভোটের সংখ্যানুপাতে) রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে। একই সাথে নির্বাচনে জিতলে কার্যকর জাতীয় সংসদ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছে জামায়াত। দলটি বলছে, তাদের ভিশন হবে সংসদকে দেশ গঠন, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করা।