জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়লাভের পর বেশ চাঙা এখন বিএনপি। দলটির এবারের টার্গেট স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আসন্ন এই নির্বাচনে শতভাগ জয় পেতে মরিয়া বিএনপি। এমন লক্ষ্য সামনে রেখে দলের তৃণমূলকে চাঙা করতে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি।
সূত্র জানায়, আসন্ন ঈদুল ফিতরের পর দলকে আরও শক্তিশালী করতে দলের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বিএনপি। মাঠ পর্যায়ে দল পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে ঈদের পর ব্যস্ত সময় কাটাবেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়েও সংস্কার করা হবে কমিটি। জেলায় জেলায় করা হবে সম্মেলন। নির্বাচনের আগে যেসব এলাকায় সমাবেশ করতে পারেননি তারেক রহমান, সেসব এলাকায় আগে যাওয়ার কথা রয়েছে তার। যেসব এলাকায় দলীয় কোন্দল রয়েছে, তা মেটাতে এরই মধ্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের। দলকে শক্তিশালী করার জন্য মূল দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে পুনর্গঠন করারও কথা রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব এলাকায় বিএনপি পরাজিত হয়েছে, সেসব এলাকার, বিশেষ করে রংপুর ও খুলনা বিভাগের ফল বিপর্যয় ভাবিয়ে তুলেছে ক্ষমতাসীন দলটিকে। কী কারণে এ দুই অঞ্চলে ভোটে ভরাডুবি, তা জানতে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে নামবে বিএনপি। ইউনিয়ন থেকে বিভাগের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ভোটে কেন এত বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল, মাঠ থেকে তার প্রকৃত কারণও খুঁজবে দলটি। এ ক্ষেত্রে সরকারের মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই না পাওয়া এবং মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সাংগঠনিক বড় দায়িত্বে দেখা যেতে পারে বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সরকার ও দল উভয়ের মধ্যেই ভারসাম্য আনতে চাইছে বিএনপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠনের দিকেও মনোযোগী হচ্ছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, এখনই সংগঠনের অভ্যন্তরে সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। এটা বিএনপিকে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে উত্তরের জেলা রংপুরের ছয়টি আসনেই জয় পেয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা, যেখানে জামায়াত ৫টি এবং একটি আসনে জিতেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলাটিতে হালে পানি পায়নি বিএনপি। এ ছাড়া রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলায় একটি আসনেও জয়ের দেখা পায়নি বিএনপি। নীলফামারীর চারটি সংসদীয় আসনেই জামায়াতের জয়-জয়কার। মুখ থুবড়ে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। উত্তরের আরেক জেলা গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন জামায়াতের প্রার্থীরা। একমাত্র গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে মাত্র ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী।
দক্ষিণ-পশ্চিমের অঞ্চল খুলনায়ও প্রায় একই চিত্র। সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর জেলায় কোনো আসনই পায়নি বিএনপি। আর বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোরÑ এই তিন জেলায় মাত্র একটি করে আসনে জয়ী হয় বিএনপি। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে বিজয়ী হয়েছে জামায়াত। বিভাগীয় রাজনীতিতে এটি দলটির সর্বোচ্চ সাফল্য। যেসব আসনে জামায়াত হেরেছে, তাও খুব বেশি ভোটের ব্যবধানে নয়। এমন পরিস্থিতিতে এখনই হাল না ধরলে পরের নির্বাচনে লেজে গোবরে হতে পারে বিএনপির রাজনীতি। তাই এসব এলাকার বিষয়ে গভীরভাবে ভাবছে বিএনপির কেন্দ্র।
উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের এসব জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির ঘরোয়া বিবাদের ফসল ঘরে তুলেছে বিরোধী পক্ষ জামায়াত। বিএনপি যেসব জায়গায় হেরেছে সেগুলোর বেশির ভাগ আসনেই ছিল বিদ্রোহী প্রার্থী। বিএনপির সঙ্গে বিএনপির লড়াইয়ের সুবিধা নেন জামায়াত প্রার্থীরা। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ডেকে মতবিনিময় করলেও থামাতে পারেননি বিদ্রোহীদের। ফলে এ দুই পক্ষের রেষারেষিতে জয়ের মালা পরেছে বিরোধী পক্ষ জামায়াত। এবার সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়তের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন মাত্র একজন, সেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন প্রায় ১০০ জন। কোনো কোনো আসনে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীও ছিলেন। যদিও বিদ্রোহীদের বেশির ভাগই পরাজিত হয়েছেন। অনেক জায়গায় ডুবিয়েছেন প্রিয় ধানের শীষকেও। এর পেছনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতা বড় প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অসন্তোষ, আবার কোথাও জোট সমীকরণের জটিলতা ভোটে বিভাজন তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কোনো কারণেই হাতছাড়া করেনি জামায়াতে ইসলামী।
বিএনপি সূত্র জানায়, দলটির হাইকমান্ড সময়-সুযোগ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তৃণমূলের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। কী কারণে এমন ফল, তা-ও খুঁজে দেখবেন। যেসব জায়গায় সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে দায়িত্বশীল নেতাদের দায়িত্ব দেবেন। যেখানে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব রয়েছে, মাঠ পর্যায়ে নিষ্ক্রিয়তা এবং তৃণমূল কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, সেসব জায়গার কমিটিগুলো ঢেলে সাজানো হবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পৌরসভার মেয়র, জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে। ধাপে ধাপে অপসারণ করা হয় ৩২৩টি পৌরসভার কাউন্সিলরদের। পরে ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একযোগে অপসারণ করা হয়। যদিও বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর স্থানীয় সরকাকে কার্যকর করতে এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটিসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে বসিয়েছে প্রশাসক। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোমধ্যে রূপালী বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে সরকার।
জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জয়ের ধারা ধরে রাখতে চায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের প্রার্থীরা যাতে ভালো ফল করতে পারেন, সে জন্য আগেভাগে মাঠে নামতে চায় বিএনপি। সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ভালো করতে চায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদায়) রুহুল কবির রিজভী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপির নতুন করে গোছানোর কিছু নাই। বড় দল, সবারই দলের জন্য ত্যাগ আছে। সবারই কিছু চাওয়া থাকে। দল তো আর সবাইকে খুশি করতে পারে না। তাই কেউ কেউ গোস্্সা করে থাকতেই পারেন। দল অবশ্যই যথাসময়ে মূল্যায়ন করবে। প্রধানমন্ত্রী জেলা সফর করবেন, সেটা তিনি নির্বাচনের আগেই বলে রেখেছিলেন। এই ধরুন, বগুড়ায় যাওয়ার কথা ছিল ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধনের জন্য। কিন্তু সেখানে উপনির্বাচনের জন্য আচরণবিধি লঙ্ঘন যাতে না হয়, সে কারণে এই সফর স্থগিত করা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন