এমন এক সময়ে বিএনপি সরকার শপথ নিয়েছে, যখন চারদিকে শুধু সংকট আর সমস্যা। এর মধ্যে অন্যতম সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এর প্রভাবে বাড়ছে সব ধরনের পণ্যের দাম। এমন বৈরী পরিস্থিতিতেও নতুন সরকার অবিচল তার অঙ্গীকার পূরণে। শক্ত হাতে রাশ টেনে ধরেছে তেলের মূল্যের। ফলে কালোবাজারি বা সিন্ডিকেটের হাতের পুতুলে পরিণত হতে পারেনি জ্বালানি তেল। শুধু তাই নয়, সরকার জানিয়েছে, দেশের জনগণের কাছে যেসব অঙ্গীকার তারা করেছেন, তার সবই পূরণ করা হবে, অন্তত সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। এদিকে দেশ-বিদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার একরকম অগ্নিপরীক্ষায় পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপ সেই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ দেখাচ্ছে, যা ইতিবাচক।
নতুন সরকার শপথ নিয়েছে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। এর একদিন পরই শুরু হয়ে যায় পবিত্র রমজান। অন্যান্যবারের মতো এবারো রমজানের সুযোগ কাজে লাগাতে উঠেপড়ে লাগে অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। শুরুতেই অস্থির হয়ে ওঠে লেবুর বাজার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে আসে লেবুর দাম। এ সময় বিএনপি নেতারা জানান, লেবু কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়। এটা না খেয়েও রাখা যায় রোজা। চাল-ডাল, তেল-নুনের দাম বাড়াতে দেয়নি সরকার। তাদের ভাষ্য, আগের মতো ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়, বর্তমান সরকার নীরবে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান সরকারের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। সরকার গঠনের এক মাস না পেরোতেই প্রতিশ্রুতি পূরণের যে ধারা তারা দেখিয়েছেন তাতে আপ্লুত সাধারণ জনগণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনেও অনেকখানি এগিয়ে গেছে সরকার।
গত মঙ্গলবার ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নারীকে শক্তিশালী করতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, বিএনপি সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে বিন্দু পরিমাণ পিছু হটবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তার কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকলে অনিয়ম-দুর্নীতি দূর হবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মতোই আগামী মাসে (এপ্রিলে) কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে কৃষি কার্ড। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করেছে বলেও জানান তিনি। একই অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কার্ডের মাধ্যমে অতীতের সরকার নয়-ছয় করলেও এবার ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে সে সুযোগ থাকছে না। এদিকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের দিন কার্ডপ্রাপ্তদের মুখগুলো ছিল আনন্দে উদ্বেলিত। সেদিন আনন্দের আতিশয্যে এক নারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ওঠেন। কিন্তু এজন্য কোনো মব সৃষ্টি করে তার কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়নি। এ ঘটনাকে সরকারের জন্য পজিটিভ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে আজ শনিবার ইমাম মুয়াজ্জিনদের সম্মানী দেওয়ার কথা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
সরকারপ্রধান তারেক রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তার প্রমাণ আবারো মিলেছে গত ১১ মার্চ সংসদীয় দলের সভায়। সেদিন মন্ত্রী ও দলের সংসদ সদস্যদের চাল-চলনে মার্জিত ও সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আঙুলে ভোটের কালির দাগ মোছার আগেই ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে বিএনপি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। মানুষ এমন বিএনপিকেই দেখতে চায়। তথ্য অনুসারে, এই ধারাবাহিকতায় আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে শুরু হবে সরকারের খাল খনন কর্মসূচি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি আঘাত হানছে। কথায় আছে- সমস্যা যখন আসে তখন চারদিক থেকে আসে। নতুন সরকার যখন দেশের সংকট সমাধানে আপ্রাণ চেষ্টা করছে, তখনই শুরু হয়েছে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের উত্তাপে তেতে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। শুধু ইরান-ইসরায়েল নয়, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের দেশগুলোতেও। এতে জ¦ালানি সরবরাহ বা আমদানিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে বা যেকোনো ছুতানাতায় বাংলাদেশসহ অন্যান্য জ¦ালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো দাম বাড়িয়ে দিত। কিন্তু বর্তমান সরকার সে পথে না হেঁটে দক্ষতার সঙ্গে শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল বিক্রিতে রেশনিং করা হলেও দাম বাড়েনি এক টাকাও।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অতীতের সরকার তো সুযোগ খুঁজত কিভাবে দাম বাড়ানোর নামে অর্থ লুট করা যায়। তারা তো মানুষের ভোটে নির্বাচিত ছিল না, তাদের তো কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। বিএনপিকে মানুষ ভোট দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছে, আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। আমরা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলে পাম্প পরিদর্শন করছি। বিপিসি রেশনিং করে তেল দিচ্ছে। এক টাকাও দাম বাড়াতে দেয়নি সরকার। আমরা বিকল্প তেলের বাজার খুঁজছি। সংকট হবে না আশা করি। আমাদের যা মজুত আছে তাতে চলতি মাসে কোনো সংকট হবে না। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে সংকট তৈরি হবে। তবে সামনে ঈদ, বাড়ি ফেরায় তেল সংকটের অজুহাতে যাতে ভাড়া বেশি নিতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখছে সরকার।
মধ্যবিত্ত পরিবার এখন মাসের শেষে সঞ্চয় নয়, টিকে থাকার হিসাব কষছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে দ্বিধায়, কারণ বাজারে অনিশ্চয়তা। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা দ্রব্যমূল্যে প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্য।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার সিন্ডিকেট, আমদানি খরচ- সব এক সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং শক্তিশালী করা, কৃষিপণ্যের সরাসরি সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং আমদানি শুল্ক সাময়িক সমন্বয় কার্যকর হতে পারে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সংকটের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি করছে দেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী দলের কাছে ডেপুটি স্পিকারের নাম চাইলেও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি তারা। বাধ্য হয়ে মুক্তযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমকে স্পিকার ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে বেছে নেয় নতুন সংসদ। প্রথম অধিবেশনেই বাজিমাত করেছে বিএনপি সরকার। সংসদকে সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু করার ঘোষণা দিয়েছেন সরকারপ্রধান তারেক রহমান। বলেছেন, বিভিন্ন দলমতের ভিন্নতা থাকলেও সমস্যা সমাধানে কোনো বিরোধ থাকবে না কারো মধ্যেই। দিন শেষ রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয় সংসদ। প্রথম অধিবেশনেই ওয়াকআউট করে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল জামায়াত জোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন প্রস্তাব এর আগে কোনো সরকারই দেয়নি। বিএনপি সরকার যেহেতু সুযোগ দিয়েছিল, সেটি নেওয়া উচিত ছিল বিরোধী দলের। এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথমদিনই প্রথামাফিক রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার কথা। সেই ভাষণ ঘিরে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে শক্ত বিরোধিতার ইঙ্গিত দিয়েছে জামায়াত। অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের শপথ নিতে সংসদের বাইরে বিক্ষোভ-মানববন্ধন করেছে এনসিপি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার চাইলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে। বাজার মনিটরিং শক্তিশালী করা, খাদ্য সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং ডলারের বিনিময় হার বাস্তবসম্মত করা- এই তিনটি সিদ্ধান্তই দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ যখন বাজারে গিয়ে দেখে দাম স্থিতিশীল, তখন সরকারের প্রতি আস্থা বাড়ে- এটি অর্থনীতির মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আশাবাদী হওয়া যায় যে, বিএনপি সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাবে।
রাজনীতি বিশ্লেষক নুরুল আমিন বেপারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকার গঠনের পর রমজান মাসে বাজার পরিস্থিতি কিংবা ইরান যুদ্ধে তেলের বাজার অস্থির হওয়া কিংবা সংসদের ভেতর-বাইরে বিরোধী দলকে মোকাবিলার মতো অগ্নিপরীক্ষায় পড়তে হচ্ছে সরকারকে। প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রী হয়েছেন অনেকে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেই সরকার চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা। প্রথমবার নির্বাচন করে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান রাষ্ট্রপরিচালনায় কতটা মুন্সিয়ানা দেখাতে পারবেন, তা বলে দেবে সময়। যদিও তারেক রহমান বিরল সৌভাগ্যের প্রতীক। তার পিতা ছিলেন রাষ্ট্রপতি, মা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কাছ থেকে দেখেছেন রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা করতে হয়। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ব্রিটেনে থেকে দেখেছেন মানুষের জন্য কিভাবে কাজ করে সরকার। তিনি হয়তো সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন।





সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন