হাম ও হামের উপসর্গের ভয়াবহ থাবায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ এবং ২৬ দিনে ১৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে এই শিশুরা মারা গেছে। শিশুদের এই প্রাণহানির মিছিল আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে? ১৬৬টি মৃত্যু কি কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে, নাকি এটি হবে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সংস্কারের টার্নিং পয়েন্ট?
বলা হচ্ছে, টিকা আসছে, কিন্তু দেরি হচ্ছে। এই দায় কার? স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফাঁকফোকর, টিকাদানের ঘাটতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। সংখ্যাটা নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন উঠছে, এই রোগের কার্যকর টিকা বহু বছর ধরেই রয়েছে। তাহলে হাম আবার এত ভয়ংকর রূপ নিল কেন?
সরকার বলছে, টিকা আসছে। বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হবে। কিন্তু এই সময়ের ব্যবধানেই হারিয়ে গেল শতাধিক শিশু। এই বিলম্বের দায় কি শুধুই ভাইরাসের, নাকি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনারও? স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন অভিমত জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, হাম সংক্রমণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এই রোগের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জেলা হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে ছিল। কেউ প্রথম ডোজ নিলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। আবার গ্রামীণ এলাকাগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির নজরদারিতে ঘাটতি ছিল এবং অনেক স্থানে এখনো আছে। হাম এমন একটি রোগ, যা টিকাদানের কভারেজ ৯৫ শতাংশের নিচে নামলেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এখন সময় এসেছে এই বিপদ ঠেকাতে, এটাকে মহামারির আগমনী বার্তা হিসেবে দেখা। তাই সবার আগে দেখতে হবে, আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই সংক্রমণ বা হাম প্রতিরোধে কতটুকু প্রস্তুত। তাদের জনবল আর সার্বিক সক্ষমতাই বা কতটা। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে শিশুদের জন্য পৃথক আইসোলেশন ব্যবস্থা অপ্রতুল। প্রয়োজনের তুলনায় বিছানা নেই। অনেক জায়গায় একই ওয়ার্ডে হাম ও নিউমোনিয়ার রোগী রাখা হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রবল।
ডা. জাকিয়া আরও বলেন, শুধু টিকা এলেই হবে না। প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ। জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জেলার তালিকা প্রকাশ এবং স্কুলভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করতে হবে। আক্রান্ত এলাকায় অস্থায়ী আইসোলেশন ইউনিট গঠন করতে হবে। আরও দরকার, প্রতিদিনের জেলাভিত্তিক তথ্য প্রকাশে সরকারের স্বচ্ছতা।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ গতকাল বৃহস্পতিবার টেলিফোনে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, টিকাদান কর্মসূচিতে কোথায় যেন একটা ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সরকারি হিসাবে দেশে ইপিআই কর্মসূচি চলমান। তবু প্রশ্ন উঠছে, সব শিশু কি নির্ধারিত সময়ে টিকা পেয়েছে? কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিকাদানে কি বিঘ্ন ঘটেছিল? প্রত্যন্ত অঞ্চলে কি টিকার ঘাটতি ছিল? এখন সব দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিগত সরকারের ওপর। গুরুত্বপূর্ণ এই টিকাদান কর্মসূচিকে অবহেলা করে তারা নিঃসন্দেহে অপরাধ করেছে। কিন্তু সেই অপরাধ নিয়ে ঘাটাঘাটির আগে প্রয়োজন শিশুদের সুরক্ষা এবং শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সেটা কি হচ্ছে?
অধ্যাপক আজাদ আরও বলেন, বিগত সরকারের অবহেলা বলে এই সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। হাম নতুন রোগ নয়। ১৪৫টি প্রাণহানির ঘটনা কেবল স্বাস্থ্য নয়, প্রশাসনিক সতর্কতারও পরীক্ষা। টিকা আরও আসবে, আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র বা যাদের সজাগ থাকা কিংবা সজাগ হওয়া দরকার, তারা কি সময়মতো জেগে উঠবেন? এই টিকা যদি আরও আগে পৌঁছাত, তাহলে কি বাঁচানো যেত শিশুদের, যারা মারা গেছে? একটি আক্রান্ত শিশু গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে, যদি টিকাদানের কভারেজ কম থাকে। তাই সবার আগে প্রয়োজন যেসব জেলায় টিকাদান কর্মসূচির দ্বিতীয় ডোজ সম্পূর্ণ হয়নি, সেখানে আগে নজর দেওয়া।
নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। ৯৫ শতাংশ টিকা কভারেজ নিশ্চিত না হলে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব থামানো কঠিন। সবচেয়ে ঝুঁকিতে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুরা।
তথ্য বলছে, বর্তমানে টিকাবঞ্চিত ও আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে হামে। ভিটামিন-এ’র ঘাটতি ও অপুষ্ট শিশুদেরও এই জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া আরেকটি বড় কারণ। গ্রামাঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুর বেশির ভাগই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এনসেফালাইটিস থেকে হচ্ছে। সময়মতো হাসপাতালে নিলে অনেক মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
ডা. সানোয়ার হোসেন আরও বলেন, হামকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। হয়তো সরকার দেখছেও না। কিন্তু একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, যাদের ঠিক এই মুহূর্তে জেগে ওঠা উচিত, তারা ওঠেননি। কেউ কেউ আবার এই সময়টাকে একটা সুযোগ মনে করে ব্যাবসায়িক ফায়দা লুটার চেষ্টা করছেন। যেমনটা হয়েছিল কোভিডের টিকা নিয়ে।
তাই এখন অনেকেরই প্রশ্ন, আপৎকালীন এই সময়ে রাষ্ট্র কি সময়মতো জেগে উঠবে, নাকি আবারও আমরা সংখ্যার পেছনে আপনজনদের মুখ চিরতরে হারাব?

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন