ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম দিনে একযোগে ১২টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ৯টি অধ্যাদেশ অবিকল রেখে বিল হিসেবে পাস করা হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয়সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একটি অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। এ সময় ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিলগুলো পাস হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বিলগুলো উত্থাপন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো অবিকল রেখে পাস হওয়া বিলগুলো হলোÑ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬; বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬; শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল, ২০২৬; বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬; পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬; বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল, ২০২৬; বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল, ২০২৬; স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬; আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল, ২০২৬।
অধিবেশনে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ পাস করা হয়েছে। এর ফলে পূর্ববর্তী অধ্যাদেশ দুটি বাতিল হয়ে গেল। এ ছাড়া ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ রহিত করে ২০০৯ সালের মূল ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পুনঃপ্রচলন করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬’ পাস করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ২০০৯ সালের আইনি কাঠামো পুনরায় ফিরে এল।
সংসদীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিলগুলো উত্থাপনের পর কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ সময় সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এ নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দল তৃতীয়বারের মতো ওয়াকআউট করে। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করছিলেন। এদিন রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সরকারি দলের বন্ধুরা (সংসদ সদস্যরা) শুধু জুলাই সনদের নোট অব ডিসেন্টকেই অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে চান। একই সঙ্গে মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য আহমাদ হানজালা সংসদ এলাকায় ‘জঙ্গি এমপি’ বলে অপবাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিকারের নোটিস দেন।
এদিকে ওয়াকআউটের আগে গতকাল বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না। এ জন্য আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি।’ এই ঘোষণা দেওয়ার পরই শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
বিরোধী দল ওয়াকআউট করার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানানোর জন্য উঠেছি। আইন প্রক্রিয়ার ফার্স্ট রিডিং, সেকেন্ড রিডিং, থার্ড রিডিংÑ সকল প্রক্রিয়ায় ওনারা সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ হাত তুলে সমর্থনও করেছেন। সমস্ত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পরে ওয়াকআউটের কোনো মানে আছে কি না, এটা জানার জন্য উঠেছি। সমস্ত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ। আশা করি, মাগরিবের নামাজের পর আবারও অংশগ্রহণ করবেন।’
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য বেদনাদায়ক দিন আজ। আলোচনা কিছুটা করতে পারলেও সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আইনটি রহিত করা হলো। তিনি বলেন, যে আইনগুলো সরকারের ক্ষমতা বাড়াতে পারে, তারা কেবল সেগুলো পাস করছে। সরকারের এই দ্বিমুখী অবস্থান দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় একতরফাভাবে আইন পাস করছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৪টি বিল পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল, জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন), সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিলে আপত্তি ছিল বিরোধী দলের।
এর আগে সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রথম অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের উত্থাপিত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬-এর আপত্তি জানিয়ে বলেন, সরকারি দলের যেসব বন্ধু আছেন, তাদের কাছ থেকে আমরা জুলাই সনদের কথা শুনি, জুলাই সনদ নাকি তারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। সেই জুলাই সনদের দুইটা পার্ট আছে, একটা পার্ট হচ্ছে বাম দিকেÑ জুলাই সনদের মূল ভাষ্য, আর ডান দিকে আছে নোট অব ডিসেন্ট। তিনি আরও বলেন, তারা (সরকার) যখন জুলাই সনদের কথা বলেন, তখন নোট অব ডিসেন্টের কথা বলেন। তারা এটাকেই অক্ষর অক্ষরে পালন করতে চান। আখতার হোসেন বলেন, ‘বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে বিচারপতি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। দেখে খুব সুন্দর মনে হয়, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। এই নেতা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮/৩-এ বলা আছে, রাষ্ট্রপতি শুধু প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগÑ এ দুইটা বাদে অন্য যত কার্যক্রম তিনি সম্পূর্ণ করবেন অর্থাৎ, প্রধান বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশন, হাইকোর্ট ডিভিশনের যত বিচারপতি নিয়োগ দেবেন, সেই বিচারপতিগুলো নিয়োগ দেওয়ার সময় তাকে অবশ্যই সংবিধানের ৪৮/৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে সেটা করতে হবে। এ কারণে ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির পরামর্শে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিধানের কথা বলা হয়েছে, সেই বিধানটা ৪৮/৩ যখন যায়, তখনই শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদদের মতো বিচারপতি নিয়োগ হয়। যেমনÑ খাইরুল হকের মতো বিচারপতি, মানিকের মতো ব্যক্তিরা ওই শেখ হাসিনার দ্বারা তখন নিয়োগ হয়েছিল। সেই দিনের সেই ধরনের একটা পরিস্থিতি বাংলাদেশে আবার চলুক এটা তো আমরা মেনে নিতে পারি না।’
এদিন সংসদ এলাকায় ‘জঙ্গি এমপি’ বলে অপবাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদে বিশেষ অধিকারের নোটিস দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এমপি এবং মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। হানজালা বলেন, গত ৩০ মার্চ সংসদ এলাকার মধ্যে তাকে প্রকাশ্যে ‘জঙ্গি এমপি’ বলা হয়। পরে সেই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তিনি সামাজিকভাবে ‘হেয় প্রতিপন্ন’ হচ্ছেন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে তার বিশেষ অধিকার ক্ষুণœ হয়েছে বলে মনে করছেন। এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদাহানির নয়; সংসদ সদস্যদের সম্মান ও নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত। যে শব্দটি আমার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, এটি একটি ফ্যাসিস্ট ওয়ার্ড।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন