ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে ন্যায়বিচারই হবে শেষ কথা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে অ্যাকসেস টু জাস্টিস প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক অর্থের অভাবে আইনের আশ্রয় কিংবা ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত থাকবেÑ এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনোভাবেই কাম্য বা প্রত্যাশিত নয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আমাকেও দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। তখন আমি নিজে কারাগারে এমন অনেককে দেখেছি, যারা শুধু আর্থিকভাবে অসচ্ছলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বা হয়েছেন।
তিনি বলেন, যেকোনো সমাজ এবং রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও শান্তির ভিত্তি হচ্ছে ন্যায়বিচার। সব যুগেই মানুষ যা চেয়েছে, তা হলো বৈষম্যহীন একটি সমাজব্যবস্থা। যেখানে তারা সমমর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। সমতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক আস্থা একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই অপরিহার্য। ন্যায়বিচার শুধু আদালত বা আইনের বিষয় নয়। এটি একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল শক্তি।
তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়ে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া সুগম করতে লিগ্যাল এইড ফার্ম তৈরি করেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি, যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার নেই, সেই দেশ কখনোই একটি গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র হতে পারে না বা হয়ে উঠতে পারে না। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশের জনগণ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এই গণতান্ত্রিক যাত্রা সুসংহত করতে রাষ্ট্রে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। আর এই ন্যায়বিচার সবার জন্য প্রযোজ্য। একজন মানুষও যাতে অর্থের অভাবে অ্যাকসেস টু জাস্টিস থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার লিগ্যাল এইড কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। একজন ভুক্তভোগী টাকার অভাবে আইনজীবীর সহায়তা নিতে পারবে নাÑ এমনটা যেন না হয়, সেটি সরকার চেষ্টা করবে সর্বতোভাবে নিশ্চিত করতে। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান নয়, এমন মানুষদের জন্য অ্যাকসেস টু জাস্টিস নিশ্চিত করতে সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেÑ যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যায়বিচারের কথা শুধু আইনের বইয়ে নয়, এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের সত্য এবং বাস্তব হয়ে উঠুকÑ এটি বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার কখনোই শুধু আদালতকেন্দ্রিক কোনো প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি জীবন্ত মূল্যবোধ, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অবশ্যই প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। ন্যায়পরায়ণতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন আইন মানুষের ওপর প্রয়োগের একটি যান্ত্রিক উপায় না হয়ে, বরং তাদের মর্যাদা সংরক্ষণ এবং প্রাপ্ত অধিকার নিশ্চিত করার একটি গভীর নৈতিক অঙ্গীকারে রূপ নেয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসেও এই ন্যায়বোধ একটি শক্তিশালী প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। যেহেতু ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার, সেই অধিকার যাতে প্রত্যেকটি মানুষ চর্চা করতে পারে। তাদের সরকার যথাসাধ্য লিগ্যাল এইড দেবে। এই লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে বিধি-বিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন এনেছে,’ জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, সারা বিশ্বের একটি কথা বিশেষভাবে প্রচলিত, সেটি হচ্ছে বিচার বিলম্ব মানেই বিচার অস্বীকার। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলার আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েক হাজার বা তারও বেশি বিরোধ-বিবাদ স্বল্প সময়ে ও কম খরচে আদালতের বাইরেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস বা বছরের পরিবর্তে বরং কয়েকটি বৈঠকের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধানগুলো করা সম্ভব হয়েছে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমেছে, সরকারের খরচও হ্রাস পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুরুল হাসান প্রমুখ বক্তব দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ অন্যান্য অতিথি উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন