শিল্প মন্ত্রণালয়ে এখন অদৃশ্য এক স্থবিরতার ছায়া। মন্ত্রণালয়ের বাইরে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির বড় বড় পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও ভেতরে জমছে ফাইলের পাহাড়। সচিবালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী সময় দিতে না পারায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে আছে টেবিলেই। ফলে শিল্পপতি, নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা পড়ছেন অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ঝুঁকিতে। তবে মন্ত্রীর দপ্তর থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মন্ত্রীর দপ্তরে শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শিল্প নিবন্ধন, নতুন কারখানার অনুমোদন, জমি বরাদ্দ, নীতিগত ছাড়পত্র, পুনর্গঠন পরিকল্পনাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ নথি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আটকে আছে ফাইলবন্দি হয়ে। অনেক ক্ষেত্রে সচিবালয় পর্যায়ে প্রক্রিয়া শেষ হলেও চূড়ান্ত অনুমোদন না মেলায় কাজ এগোচ্ছে না।
মন্ত্রী পরিষদের একজন সদস্য গতকাল শনিবার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব মূলত দেশের শিল্প খাতের নীতি প্রণয়ন, উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিল্প মন্ত্রণালয় যেহেতু উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়, তাই এর কাজের পরিধিও বেশ বিস্তৃত। শিল্পমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব ও কাজের পরিধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, শিল্পনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, নতুন শিল্প স্থাপন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, শিল্প অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মান নিয়ন্ত্রণ ও পণ্যের মান উন্নয়ন, বন্ধ বা লোকসানি শিল্প পুনরুদ্ধার, শিল্প নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দেখভাল করা। কিন্তু মন্ত্রীর ব্যস্ততার কারণে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সবখানেই। বিশেষ করে শিল্প খাতে একটা অনিশ্চয়তার ছায়া দেখা দিয়েছে’।
একজন মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে শিল্প খাত এমনিতেই নানা চ্যালেঞ্জে রয়েছে-ডলার সংকট, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকট। এর মধ্যে প্রশাসনিক ধীরগতি নতুন করে চাপ তৈরি করছে’।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কারখানা সম্প্রসারণের জন্য প্রায় দুই মাস আগে আবেদন করেছি। সব যাচাই-বাছাই শেষ। কিন্তু মন্ত্রীর সই না থাকায় অনুমোদন মিলছে না। ব্যাংকের ঋণের সুদ গুনছি, অথচ কাজ শুরু করতে পারছি না’।
শিল্পপার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক আগ্রহ দেখালেও অনুমোদন বিলম্বে অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সচিবালয়ে কর্মরত একজন যুগ্ম সচিব বলেন, ‘খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির শিল্প মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালযের মতো আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সময় ও মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই ভাগ হয়ে যাচ্ছে’। মন্ত্রী চাইলেও চাহিদা বা প্রয়োজন মতো নীতিনির্ধারণী সভা, সংসদীয় কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক বৈঠক, জেলা সফর, সব মিলিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে সরাসরি সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
যুগ্ম সচিব আরও বলেন, ‘একই ব্যক্তির কাঁধে একাধিক ভারী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলে কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকেই। এতে করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কমে যায়, আর তার প্রভাব পড়ে মাঠপর্যায়ে। শিল্প খাত একটি গতিশীল খাত। এখানে সময়মতো সিদ্ধান্ত না হলে বিনিয়োগের গতি থেমে যায়’। একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকলে সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক বলেই তিনি মনে করেন।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এর প্রভাব পড়ছে বেশি। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা বেশি বিপাকে পড়ছেন। তাদের মূলধন সীমিত, ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বিলম্ব মানেই আর্থিক ক্ষতি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন নাসিব-এর নেতা ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ মুনিরুজ্জামান স্বপন গতকাল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনেক উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প নিয়ে এগোতে চাইছেন। কিন্তু ফাইল আটকে থাকায় তারা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এতে শুধু শিল্পের বিকাশ নয়, কর্মসংস্থানের সুযোগও নষ্ট হচ্ছে’।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব খাতেও এর প্রভাব পড়েছে এবং এই অবস্থা চলতে থাকলে আরও পড়বে। শিল্প খাত দেশের জিডিপি, রপ্তানি আয় ও রাজস্বের বড় উৎস। নতুন শিল্প স্থাপন বিলম্বিত হলে সরকারের রাজস্ব আহরণও পিছিয়ে যায়। একইসঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি ব্যাহত হয়। বর্তমানে যখন মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপে অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন শিল্প খাতে প্রশাসনিক স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে’।
অর্থনীতিবিদ আবু জাফর সোলায়মান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত না এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে। শিল্পায়ন থমকে গেলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব পড়ে। দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। প্রয়োজনে ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও এসেছে’।
জাফর সোলায়মান আরও বলেন, ‘দেশ যখন শিল্পায়ন ও রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করছে, তখন প্রশাসনিক ধীরগতি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে’। উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা-মন্ত্রী যত ব্যস্তই থাকুন, শিল্প খাতের সিদ্ধান্ত যেন ফাইলের স্তূপে চাপা না পড়ে। কারণ, একটি সইয়ের অপেক্ষায় কখনো কখনো থেমে যায় কোটি টাকার বিনিয়োগ, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান আর দেশের অর্থনীতির চাকা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের এই স্থবিরতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে এর প্রভাব শুধু দপ্তরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে গোটা শিল্প খাতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-রিহ্যাব এর একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘মন্ত্রীর ব্যস্ততার কারণে শিল্প মন্ত্রণালয়ে রিহ্যাব-সংশ্লিষ্ট বহু ফাইল দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না বলে তাদের বলা হচ্ছে। ফলে মন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে আছে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত’।
রিহ্যাব-সংশ্লিষ্ট যেসব বিষয় সিদ্ধান্তের জন্য ঝুলে আছে বলে জানা গেছে, তার মধ্যে রয়েছে নতুন প্রকল্প অনুমোদন, নীতিমালার ব্যাখ্যা-সংক্রান্ত চিঠিপত্র, কর-সংক্রান্ত সুপারিশ, নির্মাণসামগ্রীর আমদানি জটিলতা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা প্রস্তাব। ফাইল জমে থাকায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা।
রিহ্যাবের একাধিক সদস্যের ভাষ্য, আবাসন খাত এমনিতেই উচ্চ সুদহার, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা ইত্যাদি সংকটে চাপে আছে। এর মধ্যে প্রশাসনিক বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। তাদের দাবি, দ্রুত সিদ্ধান্ত না হলে চলমান প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে, নতুন বিনিয়োগও থমকে যাবে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা তাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, ফাইল প্রক্রিয়াকরণ শেষ হলেও মন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় অনেক নথি পড়ে আছে। মন্ত্রী সময় দিলে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব বলেও তারা জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প ও আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এ খাতে স্থবিরতা মানে কর্মসংস্থান, ব্যাংকঋণ পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প, যেমন সিমেন্ট, রড, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়া।
আলোচ্য বিষয়ে কথা বলার জন্য মন্ত্রী এবং সচিবের সাথে টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন এই প্রতিবেদককে জানান, তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মন্ত্রীকে ব্যস্ত থাকতে হয় ঠিকই, তবে এতে করে কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটছে না। কোথাও কোনো ফাইল মন্ত্রীর ব্যস্ততার কারণে আটকে আছে এমন অভিযোগও ঠিক নয়। যারা এসব বলছে, সেটা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার মাত্র।
সচিবের একান্ত সচিব সিদ্ধার্থ ভৌমিকও এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ এ বিষয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ে কি অবস্থা সেটা তিনি বলতে পারবেন না। তবে তার মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর ব্যস্ততার কারণে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে তিনি জানান।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন