× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০২:৩৮ এএম

৬১ জেলায় তীব্র সংক্রমণ

হামের ছোবলে কাঁদছে দেশ

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০২:৩৮ এএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। আট মাসের ¯েœহার কপালে হাত রাখতেই সুলতানা আক্তারের বুক কেঁপে উঠল। শরীর পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। রাতভর কাশি, কান্না আর অস্থিরতা। প্রথমে সাধারণ জ্বর ভেবেছিলেন। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধও এনেছিলেন। কিন্তু দুদিন পর শিশুটির মুখ আর শরীরজুড়ে ছোট ছোট লালচে দাগ দেখা দিতে শুরু করে। এরপর চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তারা জানতে পারেন, ¯েœহার ‘হাম’ হয়েছে। হাম কোনো নতুন রোগ নয় ভেবে স্বামী আনিসুর রহমান আশ^স্ত করলেনÑ সেরে যাবে, চিন্তা করো না। কিন্তু দিন দিন অবনতি হতে থাকে ¯েœহার শারীরিক অবস্থার। একপর্যায়ে নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু তখন আর চিকিৎসকদের কিছু করার ছিল না। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ছোট্ট ¯েœহা।

এটি রাজধানীর গোড়ানে হামের ছোবলে তছনছ হয়ে যাওয়া একটি পরিবারের ঘটনা। দেশে সম্প্রতি হামের ভয়াবহ সংক্রমণের কারণে এমন দৃশ্য এখন শুধু এই পরিবারের নয়, বহু পরিবারেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে দেখা যাচ্ছে উদ্বিগ্ন মায়েদের দীর্ঘ অপেক্ষা, বাবাদের চিন্তামাখা মুখ আর অসুস্থ শিশুদের কান্না। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অনেকের কাছে সাধারণ শৈশবের রোগ মনে হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত সংক্রামক। শুরুতে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া কিংবা চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কয়েকদিন পর শরীরে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে জটিলতাও তৈরি হতে পারে।

তথ্য অনুসারে, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও রাঙামাটিÑ এই তিন জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলার হাজারো পরিবার ধুঁকছে হামের তীব্রতায়। এসব জেলার বেশির ভাগ পরিবারের শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে সংক্রামক এই ব্যাধিতে। শুধু তাই নয়, প্রতিদিনই আক্রান্ত শিশুদের অনেকে মারা যাচ্ছে। এই শিশুদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে দেশের আকাশ-বাতাস।  

সরকারি তথ্য জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায়ও হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে আরও ১১ শিশু। এ নিয়ে মাত্র দুই মাসে ৪৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫৬ হাজার। এমন পরিস্থিতিতে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। এদিকে হামের সংক্রমণ মহামারি আকার ধারণ করায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন এক আইনজীবী। এমন পরিস্থিতিতে হাম প্রতিরোধে একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এসব বাস্তবায়ন করা হলে হাম কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে দাবি সরকারপক্ষের।

স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা ওয়ার্ড স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, হাসপাতালগুলোতে আসা হাম আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ নজরদারিতে রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বেসরকারি হাসপাতালেও হাম আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের শতভাগ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে ঈদের পর দ্বিতীয় ধাপের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সব মিলিয়ে হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে এগোচ্ছে বলে দাবি স্বাস্থ্য বিভাগ-সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকারের কাছে চারটি দাবি তুলে ধরেছে। গতকাল মঙ্গলবার দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সঠিক সময়ে যথাযথ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের অভাব, টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা এবং গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতার কারণেই আজ হাম পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্যের এই চরম সংকটের মুহূর্তেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ধরনের জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, রোগ ছড়ানোর উৎস চিহ্নিত করা, আক্রান্তদের আইসোলেশন নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে এক ধরনের উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে দেশের মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে চার দফা দাবি জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। দাবিগুলো হলোÑ দেশের প্রতিটি অঞ্চলের জন্য অবিলম্বে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে শতভাগ হামের টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করে জরুরি ওষুধ ও পুষ্টি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে, রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বিবৃতিতে জামায়াতের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ এলাকায় হাম আক্রান্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং টিকাদান কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়।

হামের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করে স্বাস্থ্য খাতে আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে চলমান হামের টিকাদান কর্মসূচি বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘ফৌজদারি অবহেলা’ উল্লেখ করে ড. ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে ১৭ মে রিট আবেদন করা হয়। একই সঙ্গে এতে সংশ্লিষ্ট ২৪ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনা চাওয়া হয়। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলামের করা রিটের শুনানিতে গতকাল হাইকোর্ট বলেন, দেশে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ব্যবসাসহ অনেক কিছু রয়েছে। তাই তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কোনো কারণ নেই। যদি দোষী প্রমাণ হয় এক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারে আওতায় আনার কথা উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।

এদিন হাম বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল, বাকি ৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ ছিল। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৩৩৭ জন। হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে গত দুই মাসে সারা দেশে ৪৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৭ শিশুর। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৯৮ শিশু। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে (পরীক্ষায় প্রমাণিত) ৭ হাজার ৯২৯ জন। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৬ হাজার ৮৮৬ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২০৫ জনের এবং আক্রান্ত ৩২ হাজার ৯২৯ জন।

এদিকে দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সরকারি ও বেসরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা কেবিন চালু বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও রোগীদের কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাঁচ দফা বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কেবিন চালু করতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করতে হবে। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রাউন্ড দিতে হবে। রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি অভিভাবক বা দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন না বলেও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভর্তি রোগীদের তথ্য প্রতিদিন এমআইএস সার্ভারে আপলোড করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দায় এক মা তা শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। কয়েক রাত ধরে তিনি ঘুমাননি। চোখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি বলেন, শিশুটা শুধু কাঁদছে। কিছু খেতে চায় না। সারা রাত কোলে নিয়েই বসে থাকি। নিজের কথা মনে করার সময় নেই। একই রকম উদ্বিগ্ন হয়ে হাসপাতালের বারান্দায় নিজের শিশুকে ভর্তি করাতে অপেক্ষা করছেন টিকাটুলি থেকে আসা শিল্পী রায় ও অচিন্ত্য রায় দম্পতি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘœ, সচেতনতার ঘাটতি কিংবা কিছু শিশুর টিকা না পাওয়াÑ এসব কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই এই মুহূর্তে হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হচ্ছে সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। দিনমজুর বাবার জন্য সন্তানের অসুস্থতা মানে কয়েকদিনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। অনেক পরিবারকে চিকিৎসা, পরীক্ষা ও যাতায়াত খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। হামের সংক্রমণ বাড়ার এই সময়ে প্রশ্ন কেবল কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, কত শিশুর শৈশব অসুস্থতার কারণে বিছানায় থমকে যাচ্ছে। কত মা রাতভর সন্তানের মাথায় পানি ঢালছেন। কত পরিবার অজানা শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। সংখ্যা পরিসংখ্যান বলে আক্রান্তের হিসাব। কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে থাকে মানুষের গল্পÑ একটি শিশুর জ্বর, একটি মায়ের কান্না, একটি পরিবারের অপেক্ষা। তাই হামের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু চিকিৎসার জন্য নয়, এটি নিরাপদ শৈশব রক্ষারও লড়াই।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!