ঢাকা ফাঁকা হতে শুরু করেছে। টার্মিনালে মানুষের ঢল, ট্রেনের ছাদে ফিরতি উন্মাদনা, ফেরিঘাটে দীর্ঘশ্বাস মেশানো অপেক্ষা। সবকিছুই যেন একটাই শব্দে আটকে আছে, ‘বাড়ি ফেরা’। অথচ এই শহরেই থেকে যায় কিছু মানুষ, যাদের জন্য ঈদ মানে আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠা। এই মানুষগুলোর কাছে ঈদ মানে নিরানন্দ, বেদনা, কান্নার ঢল, বুক চাপড়ানো আহাজারি আর অনুপস্থিতির সঙ্গে বেঁচে থাকা। কিছু কিছু পরিবারের স্বপ্ন কখনো কখনো একটি ঘটনায় এতটাই ভেঙে যায় যে, কোনো আনন্দ দিয়েও সেটা আর কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না।
উৎসব আসলে মানুষকে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি মানুষের শূন্যতাগুলোকেও উন্মুক্ত করে। ঈদের দিন আমরা সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারি- একটি পরিবারের টেবিলে একজন মানুষ কম থাকা কত বড় নীরবতা। এই দেশে হাজার হাজার ঘরে এবার সেমাই রান্না হবে, কোরবানির মাংস ভাগ হবে, শিশুরা নতুন জামা পরে আনন্দে ঘুরে বেড়াবে রঙিন প্রজাপতির মতো। একই সময়ে কিছু ঘরে শুধু কান্না লুকানোর চেষ্টা চলবে। কারণ সব ঘরে ঈদের চাঁদ সমান আলো নিয়ে ওঠে না। কিছু আকাশে চাঁদ উঠলেও, আলো পৌঁছায় না।
ঈদে এবার আনন্দের ঢেউ উঠবে না চাঁপাইনবাবগঞ্জের তরিকুল ইসলামের বাড়িতে। ছেলে ও শ্যালককে নিয়ে ঈদ উদযাপনে গতকাল সোমবার বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু পথে টাঙ্গাইলে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তরিকুলসহ রডবোঝাই ট্রাকে যাত্রী হওয়া আরও ১৪ জন। এসব ঘরে স্বজনরা ঠিকই ফিরবেন ঈদের আগে, তবে আনন্দ নিয়ে নয়, একরাশ বিষাদ নিয়ে। তথ্য অনুসারে, সোমবার ঈদযাত্রায় সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ২১ জন। এমন করেই ঘরে ফেরা কেউ কেউ হয়তো দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ঈদে বাড়ি ফিরবেন নিথর দেহে। এসব ঘরে ঈদ বিষাদের ছায়া বয়ে নিয়ে আসবে।
এই ঈদে রামিসার মা হয়তো মেয়ের আলমারি খুলবেন না। ছোট্ট ফ্রকগুলো হয়তো এখনো ভাঁজ করে রাখা। বিছানার পাশে পড়ে থাকা খেলনাগুলো নিশ্চুপ। সন্ধ্যা নামলে হয়তো তার বুকের ভেতর আচমকা ভেসে উঠবে সেই পুরোনো ডাক- ‘মা...’। তারপর মনে পড়ে যাবে, এই ঘরে আর কোনো ছোট্ট পায়ের শব্দ নেই। বুকের ভেতর হঠাৎ নেমে আসবে শূন্যতার এক কালো ঢেউ।
ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া চার ভাইয়ের বাড়িতেও এবার ঈদ আসবে নিস্তব্ধতা নিয়ে। গ্রামের মানুষ বলছিলেন, চার ভাই একসঙ্গে বিদেশে গিয়েছিলেন সংসারের ভাগ্য বদলাতে। সেই চারজনই একসঙ্গে কফিনবন্দি হয়ে ফিরলেন। যে মা একসময় ঈদের সকালে চার ছেলের জন্য আলাদা আলাদা পাঞ্জাবি গুছিয়ে রাখতেন, এবার তিনি হয়তো চারটি কবরের মাটি ছুঁয়ে বসে থাকবেন। নারায়ণগঞ্জের সেই গার্মেন্টকর্মী তরুণী, যিনি কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে খুন হয়েছিলেন- তার বৃদ্ধ মা প্রতিবেশীদের বলছিলেন, মেয়েটি ঈদের বোনাস দিয়ে ঘরের চাল মেরামত করার কথা বলেছিল। এখন সেই ঘরের কোণে শুধু মেয়ের একটি ছবির সামনে শুকিয়ে যাওয়া ফুল পড়ে আছে। সম্প্রতি আগুনে মারা যাওয়া পুরান ঢাকার এক পরিবারের কথা মনে পড়ে। বাবা, মা আর দুই সন্তান একসঙ্গে দগ্ধ হয়েছিল। প্রতিবেশীরা বলছিলেন, বড় ছেলেটি ঈদের জন্য নতুন জুতা কিনে খুব খুশি ছিল। সেই জুতাগুলো নাকি এখনো দরজার পাশে পড়ে আছে, শুধু পা দুটো আর নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বাসচালক সোহেলের পাঁচ বছরের ছেলেটি নাকি এখনো বুঝতে পারে না, বাবা কেন ফোন ধরছে না। গত ঈদে বাবা তাকে খেলনা গাড়ি এনে দিয়েছিল। এই ঈদে শিশুটি হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকবে- ‘বাবা আসবে।’
এসব ঘটনার খবর আমরা কয়েকদিন পড়ি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি। তারপর নতুন ঘটনা এসে পুরোনো কান্নাকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু যে মা-বাবা বা স্বজনরা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাদের কাছে প্রতিটি ঈদ একই জায়গায় আটকে থাকে। এসব পরিবারের সব আলো এক দিনেই নিভে গেছে।
হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের পরিবারের কান্নাও মিশে গেছে উৎসবের স্রোতে। এখনো হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে অনেক শিশু জ্বরে কাঁপছে। কারো সারা শরীরে লাল দাগ। কেউ শ্বাস নিতে পারছে না ঠিকমতো। হাসপাতালের বেডের পাশে বসে থাকা মায়েরা রাতের পর রাত ঘুমহীন। ঈদের চাঁদ কি সেসব পরিবারে আলো হয়ে দেখা দেবে?
মুগদা হাসপাতালের বারান্দায় এক মা সাংবাদিকদের বলছিলেন, ‘ঈদের জামা কিনে রেখেছিলাম। এখন শুধু আল্লাহর কাছে চাই, আমার বাচ্চাটা বাঁচুক।’ আরেক বাবা বলছিলেন, ‘ছেলেটা বলেছিল ঈদের দিন নানুবাড়ি যাবে। এখন তিন দিন ধরে চোখই খোলেনি।’ একটি ছোট্ট কবরের পাশে বসে থাকা বাবা হয়তো এখনো বুঝতে পারছেন না, কয়েকদিন আগেও যে শিশু ঈদের জুতা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, সে এত দ্রুত মাটির নিচে চলে গেল কীভাবে। বাইরে মানুষ কোরবানির পশু কেনে, আর ভেতরে কোনো বাবা ওষুধের টাকা জোগাড় করতে ফোন করেন পরিচিতজনদের। ঈদের দিন বাইরে চলবে কোলাকুলি। তখন হাসপাতালের বিছানায় সন্তানকোলে মাকে দেখা যাবে কখনো জ্বর মাপছেন, কিংবা মাথায় পানি ঢালছেন। আর সেই শিশুটির কাছে ঈদ হচ্ছে, মাথার ওপরে ফ্যান (যদি থেকে থাকে), চারপাশে সাদা দেয়াল, রোগীদের আর্তচিৎকার, সঙ্গে স্যালাইন ও ইনজেকশনের ভয়। কোনো শিশুর জন্য কেনা নতুন জামা হয়তো হাসপাতালের ব্যাগে ভাঁজ হয়ে পড়ে থাকে, পরা হয় না।
ঈদ থমকে থাকে কারাগারে, বৃদ্ধাশ্রমে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে, পুলিশ-আনসারদের ব্যারাকে। এ রকম আরও অনেক জায়গায় যাদের স্বজন বলে কেউ নেই বা থেকেও নেই এবং যারা ঈদের ছুটিকে অন্যের জন্য আনন্দময় করে তুলতে নিজের আনন্দকে তালাবদ্ধ করে ছুটি নেননি বা পাননি। কারাগারের ভেতরে থাকা একজন বন্দি হয়তো আজও মেয়ের ছোট্ট জামার কথা মনে করেন। গত ঈদে মেয়েটি দেখা করতে এসে বলেছিল, ‘বাবা, কোরবানির ঈদে বাড়ি আসবা তো?’ তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। আরেকজন বন্দি হয়তো নামাজ শেষে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার শিশুসন্তান এবারও বাবাকে ছাড়া ঈদ করছে।
বৃদ্ধাশ্রমে ঈদের সকাল আরও ধীর। নতুন কাপড় এলেও অনেকের চোখে অপেক্ষা থাকে সন্তানের। কেউ হয়তো সকাল থেকে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন- ‘আজ হয়তো ছেলে আসবে।’ কিন্তু বিকেল গড়িয়ে রাত নামলেও অনেক দরজায় কড়া নড়ে না। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ সবচেয়ে বেশি হারায় স্পর্শ। ঈদের দিন সেই অনুপস্থিতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। টেলিভিশনে যখন পরিবারকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন বা নাটক-সিনেমা চলে, তখন বৃদ্ধাশ্রমের কোনো বিছানায় হয়তো একজন মা কিংবা বাবা নিঃশব্দে চোখ মোছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা সেই দরিদ্র ছাত্রটির ঈদও কম কষ্টের নয়। বাড়ি যাওয়ার ভাড়া নেই। মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে বলতে সে হেসে বলে, ‘আমি ভালো আছি মা।’ তারপর ফোন কেটে গেলে নিঃশব্দ রুমের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
অনেক দিন হলেও মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। মাইলস্টোন স্কুলের নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারেও এবার ঈদ হবে অন্যরকম। যে শিশুটি স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়ে বের হতো, যার খাতার ভাঁজে হয়তো আঁকা ছিল ঈদের চাঁদ- সে এখন শুধু দেয়ালে টাঙানো একটি ছবি। মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় যাদের প্রিয়জন চলে গেছে, তাদের ঘরে এবার ঈদের চাঁদ উঠবে নিঃশব্দে। যে শিশুটির বাবার হাত ধরে ঈদের বাজারে যাওয়ার কথা ছিল, সে এখন হাসপাতালের বিছানায়। যে মা ছেলের জন্য পাঞ্জাবি কিনে রেখেছিলেন, তিনি আজও সেই কাপড় বুকে চেপে কাঁদেন। দুর্ঘটনার পর থেকে তাদের ঘরের দেয়ালেও যেন শব্দের আনাগোনা কমে গেছে। আনন্দের বদলে সেখানে জমেছে আতঙ্ক, দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তা।
ঈদের সবচেয়ে বড় সত্য হয়তো এটাই- এই উৎসব মানুষকে শুধু আনন্দের কাছে নয়, তার হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোর কাছেও ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিছু পরিবারের জীবনে ঈদ এসে কেবল মনে করিয়ে দেয়- কেউ আর ফিরে আসবে না। তারা জানতে চান এই রাষ্ট্র, সমাজ আর জাতির বিবেকের কাছে, আর কত কান্না জমলে নিরাপত্তা, বিচার আর মানবিকতার আলো সত্যিই মানুষের ঘরে পৌঁছাবে? পৌঁছবে ঈদের পূর্ণ আনন্দ।

