ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরান তাদের চলমান ‘সামরিক অভিযান’ শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর জানায়, বর্তমান পর্যায়ের হামলা শেষ হয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েল যদি ভবিষ্যতেও হামলা অব্যাহত রাখে, বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে, তাহলে ইরান আগের তুলনায় আরও কঠোর ও শক্তিশালী জবাব দেবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানের মধ্যে চলছিল ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলা। গতকাল সোমবার ভোর থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান চলে। এতে শুধু দুই দেশই নয়, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়েও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘাতের প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
মূলত গত রোববার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে সামরিক অভিযান শুরু করার ঘোষণা দেয় ইরান। এরপর রোববার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকে। সোমবার সকালে হিজবুল্লাহ জানায়, তারা দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানরত একদল ইসরায়েলি সেনার ওপর রকেট হামলা চালিয়েছে। ওই এলাকায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) স্থল অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের দাবি, উত্তর ইসরায়েলের দিকে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা বন্ধ করতেই এই অভিযান চলছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, তারা উত্তর ইসরায়েলের একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, তারা ইরানের একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনার ‘একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালিয়েছে।
এদিকে আইডিএফ জানায়, তারা ইরানের ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা’র ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আইআরজিসি ইসরায়েলের দুটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রকেও দায়ী করল ইরান : ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেছেন, ইসরায়েলের আগ্রাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রও দায়ী। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান উত্তেজনা আরও বাড়লে তার পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রকেও ভোগ করতে হবে। বাঘায়ি আরও জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান বন্ধ হয়নি। তবে গত রোববার থেকে এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান একদিকে যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে, তেমনি অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনাও অব্যাহত রেখেছে। গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাÑ জাতীয় শক্তির দুটি ডানা। আমরা যুদ্ধের ময়দানও ছাড়িনি, আলোচনার টেবিলও ছাড়িনি।’
যুদ্ধবিরতির আশা প্রকাশ ট্রাম্পের : এর আগে গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল ও ইরান দ্রুত একটি ‘তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির’ দিকে এগোচ্ছে এবং পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত। এর আগে তিনি উভয় দেশকে অবিলম্বে ‘গুলি ও হামলা বন্ধ’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সংঘাতে নতুন পক্ষ হিসেবে হুথিরা : ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ঘোষণা করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ লোহিত সাগর দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলের সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করে। হুথিদের ভাষ্য, ফিলিস্তিন, গাজা, ইরান ও লেবাননের জনগণের ওপর অব্যাহত হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই অবস্থান নিয়েছে। এতে লোহিত সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ : ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এখন প্রয়োজন আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো। ইউরোপীয় নেতাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুরো অঞ্চল আরও বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
নিরাপত্তা বৈঠকে নেতানিয়াহু : ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন। ইসরায়েলি বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সীমিত পরিসরের ওই বৈঠকে শুধু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রী অংশ নেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের সেনাপ্রধানসহ জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান সরাসরি তদারকি করছেন বলে জানানো হয়। ইসরায়েলি বাহিনী এক বার্তায় জানায়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
আকাশসীমা বন্ধ, দূতাবাসে সতর্কতা : সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় ইরান পশ্চিমাঞ্চলের আকাশসীমা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই কারণে ইরাক ও সিরিয়াও সাময়িকভাবে নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও সোমবার বন্ধ রাখা হয়। দূতাবাসের সব কর্মীকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ : তেল আবিবে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে ইরানের হয়ে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ করতে সম্মত হয়েছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলেন। এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা : মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মানদ- ব্রেন্টের দাম প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৫ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি ব্যারেল ৯২ দশমিক ৭৫ ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের সরবরাহব্যবস্থা, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন