সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন তীরবর্তী বার্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও সামনে এখনো রয়ে গেছে বহু অনিশ্চয়তা। দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পথনকশা তৈরিতে সম্মত হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান জানিয়েছে। তবে বৈঠকের মাঝপথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিমূলক বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানি প্রতিনিধিদল আলোচনাস্থল ত্যাগ করায় পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, আলোচনার প্রথম পর্যায় অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবেশে এগোচ্ছিল এবং কয়েকটি বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতাও হয়েছিল। কিন্তু বৈঠক চলাকালে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের প্রতিনিধিদল, প্রেসিডেন্ট ও দেশের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকির খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
গালিবাফের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বদানকারী জেডি ভ্যান্সকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আলোচনার প্রাথমিক নীতিমালায় স্পষ্টভাবে হুমকি ও বলপ্রয়োগ পরিহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর পরই ইরানি প্রতিনিধিদল বৈঠক থেকে বেরিয়ে যায় এবং সরাসরি আলোচনায় আর ফিরে আসেনি। তবে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষভাবে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত থাকে।
মধ্যস্থতায় আলোচনার ধারাবাহিকতা : বৈঠক ভেঙে যাওয়ার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি পৃথকভাবে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। ইরান সরাসরি মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আগের আলোচনা পর্যালোচনা করে একটি যৌথ সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করা হয়। পরে কাতার ও পাকিস্তান যৌথ বিবৃতিতে জানায়, বৈঠক ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। উভয় পক্ষ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
নতুন কাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা : বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, সংঘাত এড়াতে একটি সমন্বয় সেল গঠন। এর লক্ষ্য লেবাননে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করা এবং ভবিষ্যৎ সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া রাজনৈতিক তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক নজরদারি এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে কাজ করবে। প্রধান আলোচকেরা নিয়মিতভাবে এই কমিটিকে অগ্রগতির প্রতিবেদন দেবেন।
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার জন্যও একটি বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দুর্ঘটনা ও ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখাই এর মূল লক্ষ্য।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান : আলোচনার পর দেশে ফিরে গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে এবং এটি আর কখনো যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের তত্ত্বাবধান তেহরানের অধিকার এবং ভবিষ্যতেও তা বহাল থাকবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি, লেবানন ইস্যু, তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন, আলোচনার অংশ হিসেবে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে এবং বিদেশে আটকে থাকা কিছু ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য একটি বৃহৎ উন্নয়ন কর্মসূচির কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। বরং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এখনই প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করা হলে তা মূলত খাদ্য আমদানিসহ মানবিক প্রয়োজন পূরণে ব্যবহৃত হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্ভব নয় বলেও পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন।
সবচেয়ে কঠিন ইস্যু পারমাণবিক কর্মসূচি : দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরানকে তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে হবে। অন্যদিকে তেহরান বারবার জানিয়েছে, তারা এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের পুনরায় দেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভ্যান্স। তিনি এটিকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিসর এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচিÑ এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সম্ভব নয়।
লেবানন ঘিরে নতুন সমীকরণ : আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল লেবানন পরিস্থিতি। সমঝোতার আওতায় গঠিত সংঘাত এড়ানো সমন্বয় সেলের লক্ষ্য সেখানে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে সহায়তা করা। তবে বিষয়টি নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, লেবানন ও ইসরায়েল সরাসরি আলোচনায় অংশ না নিয়েও তাদের ওপর চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন, প্রয়োজন মনে করলে দেশটি দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে অবস্থান অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে ইরানের ঘনিষ্ঠ শক্তিগুলো ইসরায়েলের উপস্থিতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক বিভক্তি : এই সমঝোতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরের অনেক নেতাই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, ইরান অত্যধিক সুবিধা পাচ্ছে। আবার অন্যদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক পথই একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান। ফলে চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু তেহরান বা ওয়াশিংটনের ওপর নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করবে।
ইরানের অভ্যন্তরেও বিতর্ক : চুক্তি নিয়ে ইরানের ভেতরেও মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। কট্টরপন্থি সংসদ সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান দাবি করেন, আলোচক দল সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। তার ভাষ্যমতে, আলোচনায় এমন কিছু বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, যা পূর্বনির্ধারিত শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যদিও ইরানের সরকারি মহল এসব অভিযোগকে বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবু ঘটনাটি দেশটির ক্ষমতাকেন্দ্রে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন