সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের শুরুতেই প্রকৃতি যেন রাজধানী ঢাকার সামনে এক রুদ্রমূর্তি নিয়ে হাজির। গত শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম ভারি বর্ষণ গতকাল রোববার সকাল নাগাদ রাজধানী ঢাকাকে জলাবদ্ধ, অচেনা ও স্থবির শহরে রূপান্তরিত করে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসটি রাজধানীবাসীর জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। মুষলধারে ঝরা বৃষ্টিতে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিÑ কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরপানি জমে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। তলিয়ে যাওয়া সড়কে গণপরিবহনের তীব্র সংকট আর যানজটে নাকাল নগরবাসীর দিনটি কেটেছে সীমাহীন দুর্ভোগে।
বৃষ্টির প্রকোপ থেকে রেহাই পায়নি দেশের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ও। মূল গেট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভবনের সামনের চত্বর ও চলাচলের পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্যান্ট গুটিয়ে ও জুতা হাতে নিয়ে পানি মাড়িয়ে অফিসে ঢুকতে দেখা গেছে। একই চিত্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও। কুয়েত-মৈত্রী, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়েন। জলাবদ্ধতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জলাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসাসেবা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মুষলধারে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে গতকাল ভোর থেকেই মিরপুর, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, মালিবাগ, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শান্তিনগর, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, কালশী, হাতিরঝিল, গুলশান লেকপাড়, বারিধারা, কাঁলাচাঁদপুর, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট, খামারবাড়ি, তেজগাঁও, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তার একাংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। মতিঝিলের আরামবাগে নটর ডেম কলেজের সামনের সড়ক ও ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়ক যেন সমুদ্রে পরিণত হয়। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার সড়কে জমে থাকা হাঁটু থেকে কোমরপানি মাড়িয়ে গন্তব্যে ছুটতে দেখা গেছে অসংখ্য মানুষকে।
মিরপুর, শেওড়াপাড়া, মতিঝিল, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেটের মতো জনবহুল এলাকাগুলো যেন ছোটখাটো নদীতে পরিণত হয়। মতিঝিলের নটর ডেম কলেজের সামনের সড়ক এতটাই তলিয়ে গিয়েছিল যে, রিকশার সিট পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে ছিল। অনেক স্থানেই দেখা গেছে রিকশাচালকেরা ভ্যানযোগে যাত্রীদের পারাপার করছেন। এদিকে নিউমার্কেট ও আজিমপুর এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় গৃহস্থালির চরম ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিনের কণ্ঠে ক্ষোভের সুর, তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর সংস্কারের নামে রাস্তা খোঁড়া হয়, কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতেই সব ডুবে যায়। কর দিলেও নাগরিক সুবিধা আমরা পাচ্ছি না।’ জলাবদ্ধতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। দোকানে পানি ঢুকে যাওয়ায় নিউমার্কেট ও কারওয়ান বাজার ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। মালামাল বাঁচাতে ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা দিনভর বিক্রি করতে পারেননি এক টাকার পণ্যও। অন্যদিকে, পরিবহনের চরম সংকটের সুযোগ নিয়েছেন রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা। সাধারণ ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ টাকা হাঁকানোয় যাত্রীদের সঙ্গে বাগবিত-া ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। মিরপুরের এক যাত্রী অভিযোগ করেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া চেয়েও অনেকে যেতে চাইছেন না।
উত্তরার বাসিন্দা মফিজুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘সকালে বনানীর অফিসে যাওয়ার পথে কুর্মিটোলা এলাকায় এসে মোটরসাইকেলটি বিকল হয়ে গেল। বাধ্য হয়েই দীর্ঘ পথ মোটরসাইকেল ঠেলে নিয়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়েছে। এমন ভোগান্তি আর কত দিন সহ্য করতে হবে?’
কারওয়ান বাজার থেকে গুলশানগামী আজাদ রহমান বলেন, বৃষ্টিতে রাস্তায় মানুষ ও যানবাহন দুটিই কম। তবে বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সিএনজি অটোচালক জামিল হোসেন জানান, জমে থাকা পানিতে কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশার ইঞ্জিন বিকল হতে দেখেছেন। চালকদের সেগুলো ঠেলে নিতে হয়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, ‘মিরপুর ২ নম্বর মসজিদ মার্কেট থেকে ১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনের ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। অথচ রিকশাচালকেরা এই দূরত্বে ভাড়া চাইছেন ১০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘এই বৃষ্টি-বাদলের দিনে অফিস যেতে এভাবেই অনেক খরচ বেড়ে যায়।’
এদিকে জিগাতলার বাসিন্দা আমিনুর রহমানের অভিযোগও একই রকম। তিনি বলেন, ‘জিগাতলা পোস্ট অফিসের সামনের বাসা থেকে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের ভাড়া ২০ টাকা। কিন্তু এদিন কাউকে ৫০ টাকার নিচে চাইতে দেখিনি।’
আরেক বাসিন্দা সাবের হোসেন বলেন, ‘বাসা থেকে বের হয়ে দেখি সড়কে হাঁটুপানি। বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। পরে ভ্যানে চড়ে ৫০ টাকা দিয়ে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে আসি। এরপর অনেক কষ্টে মতিঝিলের অফিসে যাই। এই হচ্ছে আমার সপ্তাহের শুরু।’
বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে কেবল যাত্রীরাই নন, ভোগান্তিতে পড়েন যানবাহনের চালকেরাও। অটোরিকশাচালক মো. মজিদ বলেন, ‘রিকশা নিয়ে বের হই সকালে। ভাবলাম আজকে (গতকাল) বৃষ্টি আছে, কিছু টাকা বেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু পানিতে ডুবে রিকশাই বন্ধ হয়ে গেছে। আজকে (গতকাল) সারা দিনের টাকাটাই মাইর গেল।’
আরেক অটোরিকশাচালক রহমান বলেন, ‘আমাদের তো কাজ করেই যেতে হবে, যতই বৃষ্টি হোক। এক দিন বসে থাকলেই আমাদের লস। তাই বৃষ্টির মধ্যেই বের হয়েছি। যদিও পানিতে গাড়ি চালানো কঠিন। কারণ বুঝতে পারি না কোথায় গর্ত আছে বা ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা কি না। তার মধ্যে যদি ইঞ্জিনে পানি ঢোকে তাহলে পুরো দিনই মাটি। তাই এরকম বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানো অনেক কঠিন।’
টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরও। মিরপুর ২ নম্বর এলাকায় ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন কাওসার মিয়া। তিনি বলেন, ‘এ দুই-তিন দিন ধরে যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এটা আমাদের ব্যবসার অনেক ক্ষতি করল। সব সবজির দাম তো বাড়তি আছেই। সঙ্গে আমি যে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করব বা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বিক্রি করব, সেটাও পারছি না। কারণ কাস্টমার বাসা থেকে বের হতে পারছেন না। আবার আমিও বৃষ্টিতে ভ্যান এত টেনে নিয়ে যেতে পারছি না। তাই বেচাকেনা খারাপ। তারপর আবার সবকিছুর দাম বেশি হওয়ায় মাল কিনতে পারি কম। এ কারণে আমার মতো যারা ভ্যানে করে তরকারি বিক্রি করে, সবারই বেচাকেনার অবস্থা খারাপ।’ শেওড়াপাড়ায় এক ভ্যানচালক জানান, মানুষের ভোগান্তি অনেক। অনেক কষ্ট করে ভ্যান চালাতে হচ্ছে। জনপ্রতি ভাড়া নিচ্ছেন ৫০ টাকা। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে রিকশাভাড়া ২০ টাকা।
শেওড়াপাড়ার ইব্রাহিমপুর পাকার মাথা থেকে শেওড়াপাড়া মেট্রোর নিচে আসার পথে বাচ্চাদের কেউ বলছে মিনি কক্সবাজার, কেউ বলছে নদী, কেউ বলছে অফিস-আদালত স্কুল-কলেজ সব বন্ধ করা দরকার। রিকশা ও ভ্যানের ভাড়াও অনেক বেশি। ২০ টাকার ভাড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কথা হলে শাহ আলম নামের এক ভ্যানচালক বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামতে পারছি না। সব শোরুম বন্ধ, কাজ নেই। আজ (গতকাল) কেউ মাল নিতে পারবে না বাসায়। ভ্যান দিয়ে কোনো মালামাল পরিবহন করা যাচ্ছে না।’
নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিবের মতে, পাঁচ স্তরের দীর্ঘস্থায়ী সংকট ঢাকার জলাবদ্ধতার পিছু ছাড়ছে না। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাচপিটের মুখ ময়লায় বন্ধ থাকা। ড্রেন ও খালের অবৈধ দখল। প্লাস্টিক বর্জ্যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়া, পাম্পিং স্টেশনের সক্ষমতার চরম অভাব এবং চারপাশের নদ-নদী ভরাট হয়ে পানির ধারণক্ষমতা হারানো।
এদিকে গতকাল ডিএসসিসির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শহরের বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে কমলাপুরে দুটি এবং ধোলাইখালে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পের সাহায্যে পানি নিষ্কাশন শুরু করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন আরও জানায়, ভোর থেকেই তাদের জরুরি সাড়াদান দলগুলো ড্রেন পরিষ্কার রাখতে কাজ করছে, যাতে বৃষ্টির পানি সহজে নেমে যেতে পারে।
ডিএসসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, ‘টানা ভারি বর্ষণে সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের কর্মীরা সকাল থেকেই মাঠে কাজ করছেন। আমরা জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি, যাতে দ্রুত স্বাভাবিক নাগরিক জীবন ফিরে আসে।’ তিনি রাজধানীবাসীকে ধৈর্য ধরার এবং এই সংকট উত্তরণে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন ও খাল সংস্কারের পরও প্রতি বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি নাগরিক মনে বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছেÑ উন্নয়নের সুফল আসলে কোথায়?
এদিকে আবহাওয়াবিদদের মতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় রেকর্ড করা হয়েছে ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত, যা চলতি মাসের সর্বোচ্চ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে রাজধানীর নিচু এলাকাগুলোতে জলজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সব মিলিয়ে, আষাঢ়ের এই ভারি বর্ষণ রাজধানীবাসীর জন্য স্বস্তির বদলে নিয়ে এসেছে এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আকাশে মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির অঝোর ধারা যেন রাজধানীর মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, পরিকল্পিত নগরায়ন ছাড়া কেবল প্রলেপ দিয়ে ঢাকার এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। তাদের মতে, আষাঢ়ের এই দিন রাজধানীবাসীর জন্য কেবলই একটি কর্মদিবস ছিল না, ছিল নাগরিক অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন সংগ্রাম।

