ফুটবল বিশ্বে কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো কেবল দুই দলের লড়াই নয় সেগুলো ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ, গৌরব আর জাতীয় অহংকারের প্রতীক। ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ ঠিক তেমনই। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ১৫ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ১৬ জুলাই ভোর) আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে দুই পরাশক্তি। বিজয়ী দল খেলবে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল, আর পরাজিত দল নামবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে।
টুখেলের অধীনে নতুন স্বপ্ন ইংল্যান্ডের : দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রতিভাবান কিন্তু শিরোপাহীন’ দলের তকমা বহন করছে ইংল্যান্ড। এবার সেই আক্ষেপ ঘোচানোর সুযোগ তাদের সামনে। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে নকআউটে ওঠে থমাস টুখেলের দল। শেষ ষোলোতে মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী বার্তা দেয়। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি সহজ ছিল না। নির্ধারিত সময়ে সমতা থাকলেও অতিরিক্ত সময়ে জুড বেলিংহ্যামের অসাধারণ পারফরম্যান্সে ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় ইংল্যান্ড। এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মাঝমাঠ। জুড বেলিংহ্যাম আক্রমণ ও রক্ষণÑ দুই দিকেই সমান কার্যকর। অধিনায়ক হ্যারি কেইন এখনো গোলের প্রধান ভরসা। বুকায়ো সাকা, ফিল ফোডেন ও ডেকলান রাইস মিলিয়ে ইংল্যান্ডের ভারসাম্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো।
শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে আর্জেন্টিনা : বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করেছে, বড় টুর্নামেন্টে তারা কেন সবচেয়ে ভয়ংকর দলগুলোর একটি। গ্রুপ পর্বের পর শেষ ষোলোতে মিশরকে ৩-২ গোলে হারায় লিওনেল স্কালোনির দল। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় তারা। লিওনেল মেসির অভিজ্ঞতা, লাউতারো মার্তিনেজের গোল করার ক্ষমতা, হুলিয়ান আলভারেজের গতিময়তা এবং এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নিয়ন্ত্রিত মাঝমাঠ সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা এখনো বিশ্বের অন্যতম পরিপূর্ণ দল।
১৯৬৬ থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা : বিশ্বকাপে প্রথম দেখা হয় ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে। ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে এবং পরে নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপাও জিতে নেয়।
সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাট্টিনকে বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখানো হয়। আর্জেন্টিনায় আজও অনেকে সেই সিদ্ধান্তকে অন্যায় বলে মনে করেন। এই ম্যাচ থেকেই দুই দেশের ফুটবল সম্পর্কের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার বীজ বপন হয়।
১৯৮৬, ‘হ্যান্ড অফ গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোল : মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি। চার বছর আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। সেই আবহে মাঠে নামেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। প্রথম গোলটি করেন হাত দিয়ে, যা ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত। কয়েক মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যে গোলটি করেন, সেটি পরে ফিফার ভোটে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে পরে বিশ্বকাপও জেতে। এই ম্যাচ দুই দেশের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে যায়।
১৯৯৮, বেকহামের লাল কার্ড : ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ২-২ সমতায় শেষ হয়। তবে দ্বিতীয়ার্ধে দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারায় ডেভিড বেকহাম লাল কার্ড দেখেন। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন বেকহামকে এই পরাজয়ের জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
২০০২, ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ : জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আবার দেখা হয় দুই দলের। এবার প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। ডেভিড বেকহামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় তারা। ১৯৯৮ সালের হতাশার পর এই জয় ইংলিশ ফুটবলে নতুন আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।
পরিসংখ্যান যা বলছে : বিশ্বকাপে দুই দলের প্রতিটি ম্যাচই ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কখনও ইংল্যান্ড, কখনো আর্জেন্টিনা জিতেছে। তবে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা ঐতিহাসিকভাবে কিছু স্মরণীয় সাফল্য পেয়েছে, আর ইংল্যান্ডের বড় অর্জন এসেছে ১৯৬৬ ও ২০০২ সালে। দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু ফলাফলের নয়, বরং স্মরণীয় ঘটনা, বিতর্ক এবং কিংবদন্তি ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের কারণেও অনন্য।
এবার কী হতে পারে : এই সেমিফাইনালে দুই দলই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। ইংল্যান্ড চাইছে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ শিরোপার আরও কাছে যেতে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা। একদিকে জুড বেলিংহ্যাম, হ্যারি কেইন, সাকা ও ফোডেন; অন্যদিকে লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্তিনেজ, আলভারেজ ও এনজো ফার্নান্দেজ। তারকায় ভরা এই লড়াইয়ে সামান্য ভুলও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। ইতিহাস বলছে, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ কখনো শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়। এটি আবেগ, গৌরব, প্রতিশোধ ও বিশ্বকাপের স্মরণীয় অধ্যায় রচনার মঞ্চ। ২০২৬ সালের সেমিফাইনাল সেই ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করার অপেক্ষায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন