শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর সংসদ ভবন ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা এবং উত্তরায় রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করেন তারা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এক ফাঁকে সায়েন্স ল্যাব ছেড়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ঘেরাও করেন। দিনভর আন্দোলনে সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনা প্রকাশ করেন। তবে বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বলছে, শিক্ষার্থী নিহতের খবরটি গুজব। পুলিশের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই।
চলতি সপ্তাহে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনকে পুঁজি করে বিভিন্ন পক্ষের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘গুজব’ ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ দলটির পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনে বহিরাগতরা ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মীদের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও শেয়ারকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে, যার পুরোটাই ফেক নিউজ বা গুজব বলে প্রমাণ করেছে ফ্যাক্ট চেক সংস্থাগুলো।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিকেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মঙ্গলবারের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সাইবার মনিটরিং করছে। ফেক নিউজ বা গুজব ছড়ানো আইডি শনাক্তে কাজ চলছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট জানায়, এইচএসসি-২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিসহ একাধিক দাবি নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলনে বিভিন্ন স্থানে গুলি বা নিহত হওয়ার ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে আওয়ামীপন্থি বিভিন্ন পেজ থেকে। দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে সারা দেশে কোথাও নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার বলছে, আন্দোলনে প্রথম নিহত শিক্ষার্থীর ছবির পর এবার ছড়াচ্ছে আহত এক শিক্ষার্থীর এআই ছবি। এ ছাড়া ঢাকায় সাত শিক্ষার্থী নিহতের খবরও গুজব বলে জানায় তারা। আরেক ফ্যাক্ট চেকে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পুলিশ ও ছাত্রদলের হামলায় আহতদের দৃশ্যÑ দাবিতে ছড়ানো ছবিটি চট্টগ্রামের পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার।
মূলত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশ্নপত্রের মান ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর অবমাননাকর মন্তব্যের (ফার্মের মুরগি) প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, মিছিল ও মানববন্ধন করেন পরীক্ষার্থীরা। বিকেলের দিকে তারা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেন। এই ঘোষণার পর সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেন তারা। সেখান থেকে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের সরিয়ে দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক ইস্যু যুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট ও পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে আন্দোলনের গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আন্দোলনস্থলে উপস্থিত এক তরুণীকে একটি ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা শেখ হাসিনাকে আবার ফিরে আনতে চাই। পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও চাই। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ছাড়া বহিরাগতরা সেখানে ঢুকে আন্দোলনের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এমন কয়েকজনকে শনাক্ত করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত মো. ওমর ফারুক প্রিন্স তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলামের নামে একটি কথিত ফটোকার্ড শেয়ার করেন। অভিযোগ রয়েছে, ফটোকার্ডটি ভুয়া। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই পোস্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে উসকানিমূলক বার্তা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনান তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ৫ আগস্টের আগের একটি ভিডিও পুনরায় শেয়ার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভিডিওটি বর্তমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর পোস্ট ও পুরোনো ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির অপচেষ্টা হতে পারে। তাই এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ এবং আন্দোলনের যৌক্তিক দাবিকে রাজনৈতিক অপপ্রচার থেকে দূরে রাখার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার গুজব ছড়াচ্ছে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ভুয়া পেইজ। সবাইকে অনুরোধ করা যাচ্ছে, এ ধরনের ভুয়া প্রচারণা ও অপতথ্য থেকে সতর্ক থাকুন। কোনো তথ্য শেয়ার বা প্রচারের আগে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তা যাচাই করুন এবং গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা প্রতিহত করুন।
আন্দোলনে ঢুকে পড়েছেন বহিরাগতরা : গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ও কয়েকটি জেলায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগতদের অংশ নিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরিচয়ে বহিরাগতদের বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করতেও দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকস্মিক বন্যা ও টানা বর্ষণে চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জেলায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। দেখা দেয় মানবিক বিপর্যয়। এর মধ্যে গত রোববার আকস্মিক বৃষ্টিতে ঢাকায় জলবদ্ধতা তৈরি হয়ে ব্যাপক ভোগান্তি দেখা দেয়। ওই দিন ঢাকার অনেক অঞ্চলে কোমরপানি জমে সবকিছু তলিয়ে যায়। বৃষ্টির মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত করার সুযোগ থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা বন্ধ করেনি, যা নিয়ে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালেন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। তার এক বিস্ফোরক মন্তব্য ‘তারা তো ফার্মের মুরগি, বৃষ্টিতে ভিজলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন’ ক্ষোভের আগুন আরো বাড়িয়ে দেয়। যদিও শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যর সতত্যা পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ কয়েক জেলায় এইচএসসি শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ নানা দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে বহিরাগতরা যুক্ত হয়। তারা আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নানা উসকানিমূলক স্লোগান, শিক্ষা ভবন ঘেরাও, এমনকি সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের চেষ্টা করে।
সূত্র আরও জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিভিন্ন বহিরাগত যুক্ত হয়। তবে এসব বহিরাগত কারা, তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি সমর্থিতরা শিক্ষার্থী সেজে এ আন্দোলনে যুক্ত হতে পারে।
সরেজিমনে দেখা গেছে, রাজধানীর উত্তরায় আন্দোলনস্থলে কয়েকজন নিজেদের শিক্ষার্থী পরিচয় দিতে না পেরে সেখান থেকে চলে যায়। উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আন্দোলনের সময় এ ঘটনা দেখা যায়। সকাল থেকে ওই সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের পরিচয় জানতে চাইলে একজন বলেন, তিনি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী নন। কেন এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সমর্থন জানাতে এসেছেন। পরে তিনি নিজেকে একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে দাবি করেন। আরেক ব্যক্তিও নিজেকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দেন। তবে কোন শ্রেণিতে পড়েনÑ এ প্রশ্ন করা হলে তিনি দৌড়ে সেখান থেকে চলে যান। এছাড়া আরও কয়েকজন আন্দোলনে অংশ নিলেও তারা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। কিছু কিছু এলাকায় আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের চেয়ে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে দেখা গেছে। স্কুল পড়ুয়া এসব শিক্ষার্থীর সঙ্গে এ আন্দোলনের সম্পর্ক না থাকায় তাদের আন্দোলনে আসা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিএনপি বলছে, সরকারকে বিব্রত করতে একটি কুচক্রী মহল বহিরাগতদের আন্দোলনে পাঠাচ্ছে। তাদের এ ধরনের অপতৎপরতা সফল হবে না। এই আন্দোলনের পেছনে কাদের অসৎ উদ্দেশ্য ও ইন্ধন রয়েছে, তা নিয়ে গোয়েন্দারা কাজ করছে।
এদিকে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে অসন্তোষের জেরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বিকেলে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়েও অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। এর আগে বকশীবাজারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। সেখানে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। উত্তরা ছাড়াও বরিশালে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক এবং ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি কুমিল্লা, বগুড়া ও ময়মনসিংহে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এসব দাবি পূরণে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা। দাবিগুলো হলোÑ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, তার বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্ষমা চাওয়ার ইস্যুটা এসেছে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের একটি অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে, যে অডিও ক্লিপে শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করেন মন্ত্রী। এর পরেই মন্ত্রীর অপসারণ চেয়ে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন