× UCB Sticker Card
বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৪:১৬ এএম

সাম্বার ছন্দে থেমে গেল সামুরাই

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৪:১৬ এএম

সাম্বার ছন্দে থেমে গেল সামুরাই

মাঠে শেষ বাঁশি বাজতেই মনে হলো হিউস্টনের আকাশে সূর্যটা যেন আবার উঠেছে। সবুজ ঘাস মুহূর্তেই হারিয়ে গেল হলুদের উল্লাসে। গ্যালারি থেকে নেমে আসা আনন্দ, মাঠে ছুটে চলা ফুটবলার, বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো কোচ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আবেগঘন দৃশ্য। দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন কার্লো আনচেলত্তি। তার মুখে সেই চিরচেনা স্থিরতা, কিন্তু চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা স্বস্তি বলে দিচ্ছিল, এই জয় কেবল একটি ম্যাচ জেতার আনন্দ নয়, বরং একটি জাতির ফুটবল-আত্মবিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।

আর একটু দূরে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। দুই হাত প্রসারিত, সতীর্থদের আলিঙ্গনে হারিয়ে যাচ্ছেন। যেন তিনিও বিশ্বাস করতে পারছেন না, শেষ মুহূর্তে তার পায়ের ছোঁয়ায় লেখা হয়ে গেছে নতুন এক ইতিহাস আর ব্রাজিলের নতুন এক বিশ্বকাপ-অধ্যায়।

বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর কিছু রাতকে ইতিহাসে অমর করে রাখে। একটি জাতির আবেগ, একটি দলের চরিত্র এবং কোটি মানুষের স্বপ্নকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। হিউস্টনের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই একটি রাত। এমন এক রাত, যেখানে পরাজয়ের অন্ধকার আর জয়ের আলো পাশাপাশি হেঁটেছে। যেখানে প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে দেখে মনে হয়েছে, তারা যেন নিজেদেরই চিনতে পারছে না; আর শেষ বাঁশি বাজতেই সেই একই দল রচনা করেছে এক দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের কাব্য।

হিউস্টনের আকাশে তখনও আলো ঝলমল করছে। গ্যালারিতে ৬৮ হাজার ৭৭৭ দর্শক। কারো গায়ে হলুদ, কারও গায়ে নীল। কেউ প্রার্থনা করছে সাম্বার জাদুর জন্য, কেউ অপেক্ষা করছে জাপানের আরেকটি বিস্ময়ের। কিন্তু রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। সবুজ মাঠ ঢেকে গেল হলুদের উল্লাসে। গ্যালারি থেকে যেন নেমে এল এক বিশাল ঢেউ। ফুটবলাররা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সবসময় শান্ত, সংযত, অভিব্যক্তিহীন এই ইতালিয়ান কোচের মুখেও তখন চাপা স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। মনে হচ্ছিল, বুকের ওপর জমে থাকা এক পাহাড় নেমে গেছে। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। দুই হাত প্রসারিত। সতীর্থদের ভালোবাসায় হারিয়ে যাওয়া এক নায়ক। হয়তো তিনিও তখন বুঝে উঠতে পারছিলেন না, তাঁর ডান পায়ের এক শট শুধু একটি গোলই দেয়নিÑ একটি জাতির স্বপ্নকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছে। বিশ্বকাপে কিছু গোল থাকে, যেগুলো শুধু স্কোরবোর্ড বদলায়। আবার কিছু গোল থাকে, যেগুলো ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। মার্তিনেল্লির গোলটি ছিল দ্বিতীয় ধরনের।

ম্যাচের শুরুতে ব্রাজিলকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন নিজেদের ছায়ার সঙ্গে খেলছে। বল ছিল তাদের দখলে। মাঠের বড় অংশে নিয়ন্ত্রণও ছিল। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণে প্রাণ ছিল না। সাম্বা ফুটবলের যে স্বতঃস্ফূর্ত সৌন্দর্য, তা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। প্রতিটি আক্রমণ এসে থেমে যাচ্ছিল জাপানের শৃঙ্খলাবদ্ধ ডিফেন্সে।

একসময় ব্রাজিলকে বলা হতো সৌন্দর্যের অন্য নাম। বল পায়ে নাচতে নাচতে প্রতিপক্ষকে ভেঙে ফেলার নাম ছিল ব্রাজিল। কিন্তু হিউস্টনের প্রথম ৪৫ মিনিটে সেই ব্রাজিলকে যেন কোথাও খুঁজেই পাওয়া গেল না। মাতেউস কুনিয়ার দূরপাল্লার একটি শট ছাড়া উল্লেখ করার মতো সুযোগও তৈরি করতে পারেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

বরং যত সময় গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে ভুল। ব্রুনো গিমারাইসের একটি পাস সোজা গিয়ে লাগে লুকাস পাকেতার মুখে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বিরক্ত হয়ে হাত তুলে চিৎকার করছেন। এমন দৃশ্য সাধারণত ছোট দলের মধ্যে দেখা যায়, ব্রাজিলের মতো দলের মধ্যে নয়।

আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, একবার নয়, দুবার নিজেদের খেলোয়াড় নিজেরাই একে অপরকে ট্যাকেল করলেন। যেন সবাই একই ভাষায় কথা বলছেন, কিন্তু কেউ কারো কথা বুঝতে পারছেন না। ডাগআউটে বসে আনচেলত্তি নিশ্চয়ই ভাবছিলেন, এই কি সেই দল, যাদের নিয়ে তিনি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন?

এই বিশৃঙ্খলার সুযোগটাই কাজে লাগাল জাপান। ২৯ মিনিটে মাঝমাঠে দানিলোর ভুল। বল কেড়ে নিলেন কাইশু সানো। তারপর যেন পুরো দৃশ্যটা ধীরগতির চলচ্চিত্র। কাসেমিরো সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু সানো থামলেন না। একটু এগোলেন, আরও এগোলেন, তারপর দূরপাল্লার এক দুর্দান্ত শট। আলিসনের ডান হাত বাড়ল, কিন্তু বল আরও দ্রুত। জাল কাঁপল। হিউস্টনের একাংশ মুহূর্তেই যেন টোকিওতে পরিণত হলো। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল, আর সেটিও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে। ফুটবল কখনো কখনো এমনই নিষ্ঠুর সুন্দর। বিরতির সময় সেই কথোপকথন হয়তো কখনোই জানা যাবে না। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামা ব্রাজিল দেখে বোঝা যাচ্ছিল ড্রেসিংরুমে কিছু একটা বদলে গেছে।

আনচেলত্তি কখনো চিৎকার করে দলকে জাগিয়ে তোলার কোচ নন। তিনি বিশ্বাস করেন সঠিক সিদ্ধান্তে। পাকেতার জায়গায় এনদ্রিককে নামানোর সিদ্ধান্তটি যেন পুরো ম্যাচের ছন্দ বদলে দিল। ব্রাজিলের পাসে ফিরে এলো গতি, আক্রমণে ফিরে এলো ধার, খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় ফিরে এলো আত্মবিশ্বাস। তারপর এলো কাসেমিরোর মুহূর্ত। ৫৬ মিনিটে মার্তিনেল্লির দারুণ এক ক্রস ভেসে এলো। কাসেমিরো লাফিয়ে উঠে শক্তিশালী হেড করলেন। বল জালে। এক মুহূর্তেই পুরো স্টেডিয়ামের আবহ বদলে গেল।

সমতা ফেরার পর যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তোমিয়াসুকে নাটমেগ করে দুরন্ত গতিতে বক্সে ঢুকে তার নেওয়া শটটি গোল হতে পারত অনায়াসেই। কিন্তু জিওন সুজুকির অসাধারণ সেভ জাপানকে তখনও ম্যাচে বাঁচিয়ে রাখল। সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল। ম্যাচ এগোচ্ছিল অতিরিক্ত সময়ের দিকে। ব্রাজিল আক্রমণ করছিল, কিন্তু গোল আসছিল না। গ্যালারিতে উৎকণ্ঠা বাড়ছিল প্রতি মুহূর্তে। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিট। রায়ান আকাশে লড়ে বল জিতলেন। বল এল ব্রুনো গিমারাইসের কাছে। তিনি চাইলে নিজেই শট নিতে পারতেন। কিন্তু বড় খেলোয়াড়রা জানেন, কখন নিজের নামের চেয়ে দলের নাম বড়। তিনি নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়ে দিলেন মার্তিনেল্লির উদ্দেশে। একটি নিয়ন্ত্রণ। একটি শট। সুজুকির আঙুল ছুঁয়ে বল গিয়ে লাগল ডান পোস্টের ভেতরের দিকে। তারপর জাল। সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তারপর বিস্ফোরিত হলো হিউস্টন। হলুদ জার্সির ঢেউ গ্যালারি থেকে মাঠে নেমে এলো। খেলোয়াড়েরা ছুটে গেলেন মার্তিনেল্লির দিকে। আনচেলত্তি মাথা নিচু করে হাসলেন। ব্রাজিলের সমর্থকদের চোখে তখন আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে অশেষ স্বস্তি। মার্তিনেল্লি পুরো ম্যাচজুড়ে ছিলেন পরিশ্রমী, গতিময় এবং বিপজ্জনক। একটি অ্যাসিস্ট করার পর শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় তারকা হওয়ার জন্য সবসময় বড় নামের প্রয়োজন হয় না; বড় মুহূর্তের প্রয়োজন হয়।

তবে এই জয় যেমন আনন্দের, তেমনি সতর্কবার্তাও। প্রথমার্ধের ব্রাজিল আর দ্বিতীয়ার্ধের ব্রাজিল যেন দুটি ভিন্ন দল। একটি দল ছিল আত্মবিশ্বাসহীন ও এলোমেলো। অন্যটি ছিল সাহসী, সংগঠিত এবং প্রাণবন্ত। বিশ্বকাপ জিততে হলে এই দ্বিতীয় ব্রাজিলকেই পুরো নব্বই মিনিট ধরে খেলতে হবে। কার্লো আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় কাজ এখন কৌশল আঁকা নয়; বরং এই দুই ব্রাজিলকে এক ব্রাজিলে রূপ দেওয়া। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের পাঁচটি শিরোপার প্রতিটির পেছনেই ছিল কঠিন সংগ্রামের গল্প। ১৯৫৮-তে তরুণ পেলের বিস্ময়, ১৯৭০-এ শিল্পের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ, ১৯৯৪-এ ধৈর্য, ২০০২-এ পুনর্জন্ম। হয়তো ২০২৬-ও নতুন কোনো মহাকাব্যের দিকে এগোচ্ছে।

তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে হিউস্টনের রাত অন্তত এটুকু প্রমাণ করেছে, এই ব্রাজিল এখনো শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস হারায় না। তারা এখনও লড়তে জানে। তারা এখনও ঘুরে দাঁড়াতে জানে। আর যতদিন হলুদ জার্সি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাবে, ততদিন বিশ্বকাপের ট্রফি তাদের নাগালের বাইরেও থাকবে না। হিউস্টনের সেই রাত তাই শুধু একটি জয় নয়, এটি ছিল একটি পুনর্জন্মের গল্প। একটি দলের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। একজন অভিজ্ঞ কোচের ধৈর্যের গল্প। কাসেমিরোর অদম্য মানসিকতার গল্প। আর সবকিছুর ওপরে, এটি ছিল গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি নামের এক তরুণ নায়কের গল্প, যিনি শেষ মুহূর্তে একটি শটে কোটি মানুষের হৃৎস্পন্দনকে আবার ছন্দে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

ফুটবল এমনই। কখনো নব্বই মিনিট ধরে অপেক্ষা করায়। তারপর এক মুহূর্তেই ইতিহাস লিখে ফেলে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!