গ্রুপ এল-এ ইংল্যান্ড নিজেদের সেরাটা দেখিয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী শুরু, ঘানার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র এবং শেষ ম্যাচে পানামাকে হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করে থ্রি লায়ন্স। তবে ফল ভালো হলেও তাদের আক্রমণভাগ প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারালো ছিল না। মাঝেমধ্যে সৃজনশীলতার ঘাটতি চোখে পড়েছে, যা নকআউট পর্বে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবু জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইনের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডকে এখনো অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে ধরে রেখেছে। বিশ্বকাপ যত নকআউট পর্বের দিকে এগোয়, ততই ফুটবল যেন কেবল একটি খেলা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে স্নায়ুর পরীক্ষা, সাহসের গল্প এবং স্বপ্নের লড়াই। বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও ডিআর কঙ্গো। মাঠে নামবে দুই ভিন্ন মহাদেশের দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনÑ একদিকে বহু বছরের ঐতিহ্য আর শিরোপার আকাক্সক্ষা, অন্যদিকে সীমাহীন আত্মবিশ্বাস নিয়ে উঠে আসা এক আফ্রিকান শক্তি।
ইংল্যান্ডের লক্ষ্য এবার শুধু জয় নয়
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই ইংল্যান্ডকে ঘিরে প্রত্যাশার শেষ থাকে না। ১৯৬৬ সালের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি এখনো ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় অহংকার। কিন্তু সেই গৌরবের পর বহুবার সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ট্রফি ছুঁতে পারেনি তারা।
২০২৬ বিশ্বকাপে অবশ্য শুরু থেকেই অন্য এক ইংল্যান্ডকে দেখা গেছে। গ্রুপ পর্বে তারা খেলেছে পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত এবং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল। বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়া, সুযোগ তৈরি করা এবং রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রাখাÑ এই তিন দিকেই তারা ছিল ধারাবাহিক।
অধিনায়ক হ্যারি কেইনের অভিজ্ঞতা, জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, বুকায়ো সাকার গতি এবং ডেকলান রাইসের ভারসাম্য দলটিকে করেছে আরও পরিণত। কোচের কৌশলও স্পষ্টÑ ধৈর্য ধরে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সুযোগ এলে নির্মমভাবে আঘাত হানা।
২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের পথচলা
গ্রুপ এল-এ ইংল্যান্ড শুরু থেকেই নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিটি ম্যাচেই তারা বল দখল, পাসিং এবং আক্রমণভাগে প্রতিপক্ষের তুলনায় এগিয়ে ছিল। রক্ষণভাগও ছিল বেশ সংগঠিত, ফলে খুব কম সুযোগই প্রতিপক্ষকে দিতে হয়েছে।
এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণেই তারা গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে এসেছে। এখন তাদের লক্ষ্য একটিÑ বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা।
যারা ভয়কে জয় করেছে
বিশ্বকাপে অনেক দলই আসে, কিন্তু সবাই গল্প তৈরি করতে পারে না। ডিআর কঙ্গো সেই গল্প লিখছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে খুব কম মানুষই তাদের নকআউটে দেখার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে তারা প্রমাণ করেছে, বড় নাম নয়Ñ বড় পারফরম্যান্সই আসল। কঠিন গ্রুপে প্রতিটি ম্যাচে লড়াই করে তারা শেষ পর্যন্ত নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে। শারীরিক শক্তি, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং দলগত সংহতি তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
এই দলটি কখনো অযথা বল দখলে বিশ্বাস করে না। প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষা করে, তারপর বিদ্যুৎগতির আক্রমণে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই কৌশলই এবারের বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আফ্রিকার নতুন প্রতিনিধি
আফ্রিকার ফুটবল দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ক্যামেরুন, সেনেগাল, ঘানার মতো দলের পর এবার ডিআর কঙ্গোও দেখাতে চাইছে যে আফ্রিকান ফুটবল আর শুধু প্রতিভার নয়, কৌশল ও পরিপক্বতারও প্রতীক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেলে সেটি শুধু একটি ম্যাচ জেতা হবে না; এটি হবে আফ্রিকান ফুটবলের আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
দুই দলের দুই রকম দর্শন
ইংল্যান্ডের ফুটবলে ছন্দ আছে, পরিকল্পনা আছে, ধৈর্য আছে। তারা ধীরে ধীরে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ডিআর কঙ্গোর ফুটবলে রয়েছে বিস্ফোরণ। একটি ভুল, একটি দ্রুত পাস কিংবা একটি ফাঁকা জায়গাই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাই ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে মাঝমাঠে। যে দল মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করবে, ম্যাচের গতিপথও অনেকটা তার দিকেই ঝুঁকে যাবে।
উত্তেজনার কমতি নেই
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই দুই দলের কখনো মুখোমুখি হওয়ার ইতিহাস নেই। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চেই প্রথমবার দেখা হচ্ছে তাদের। প্রথম সাক্ষাৎই যখন নকআউটে, তখন উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। কারণ এখানে অতীতের কোনো পরিসংখ্যান নেই; আছে শুধু বর্তমানের পারফরম্যান্স।
তারকাদের দিকে থাকবে সবার নজর
ইংল্যান্ডের আক্রমণের মূল ভরসা হ্যারি কেইন। মাঝমাঠে জুড বেলিংহাম ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারেন মুহূর্তেই। বুকায়ো সাকার গতি এবং ডেকলান রাইসের উপস্থিতি দলকে আরও ভারসাম্য দেয়।
অন্যদিকে ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলগত ফুটবল। দ্রুতগতির উইঙ্গার, শক্তিশালী মিডফিল্ড এবং আক্রমণভাগের কার্যকর সমন্বয়ই তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা।
নব্বই মিনিটের গল্প
নকআউট ফুটবলে ফেভারিট বলে কিছু থাকে না। একটি ভুল, একটি কর্নার, একটি ফ্রি-কিক কিংবা গোলরক্ষকের একটি অসাধারণ সেভÑ সবকিছুই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের চিত্র। ইংল্যান্ড মাঠে নামবে নিজেদের মর্যাদা ধরে রাখতে। ডিআর কঙ্গো নামবে ইতিহাস লিখতে। একজন এগিয়ে যাবে শেষ ষোলোর পথে, অন্যজনের বিশ্বকাপ যাত্রা থেমে যাবে সেখানেই।
তাই বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার এই লড়াই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; এটি হবে অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাহসের, ঐতিহ্যের সঙ্গে স্বপ্নের এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তির সঙ্গে নতুন সম্ভাবনার এক অনন্য দ্বৈরথ। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন গল্পই তো বারবার ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত করেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন