× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৭:২৬ এএম

এভাবেও ফিরে আসা যায়

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৭:২৬ এএম

এভাবেও ফিরে আসা যায়

আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় তখন পৈশাচিক নীরবতা। ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়েছে ৭৯ মিনিট। স্কোরবোর্ডের জ্বলজ্বলে হরফগুলো এক রূঢ় সত্যের জানান দিচ্ছিল, হেরে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা, থেমে যাচ্ছে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা। কারণ, মিশরের বিপক্ষে খেলায় আর্জেন্টিনা তখনো ২-০ গোলে পিছিয়ে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা তখন খাদের শেষ কিনারায় দাঁড়িয়ে। গ্যালারির আকাশি-নীল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো তখন স্তব্ধ, হাজারো ভক্তের চোখজুড়ে তখন অশ্রুর মেঘ। ঠিক তখনই শুরু হলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অলৌকিক রূপান্তর। যে দলটির শতবর্ষের ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপের মঞ্চে অন্তত দুই গোলে পিছিয়ে পড়ালে তারা মাঠ ছেড়েছে পরাজিতের গ্লানি নিয়ে, সেই আলবিসেলেস্তারা এদিন মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে লিখল অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের উপাখ্যান। ম্যাচের ৭৯ থেকে ৯২ মিনিট; আর্জেন্টিনার জন্য এই সংক্ষিপ্ত তেরো মিনিটের সময়টুকু ছিল খাদের কিনারা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে ওঠার মহাজাগতিক দলিল। এই তেরো মিনিটে ৩ গোল দিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা, এরপর লিওনেল মেসির অশ্রুসিক্ত চোখও সতীর্থদের বুনো উল্লাস নির্দেশ করে ফুটবলীয় চরিত্রের এক চরম পরাকাষ্ঠাকে।

ম্যাচের শুরুটা দমবন্ধ করা হওয়ার কথা ছিল না। ম্যাচের প্রথমার্ধের পুরোটা সময় বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রেখে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কোণঠাসা করে রেখেছিল মেসিবাহিনী। কিন্তু ফুটবলের নির্মম রসায়ন এদিন ভিন্ন চিত্রনাট্য তৈরি করছিল। ম্যাচের মাত্র ১৫ মিনিটেই লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাঁকি দিয়ে মারওযান আত্তিয়ার নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে মিসরকে এগিয়ে নেন ইয়াসের ইব্রাহিম। বিশ্বসেরা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ কেবল দর্শক হয়ে সেই বলের জাল স্পর্শ করা দেখলেন। এই আকস্মিক ধাক্কা সামলে আর্জেন্টিনা যখন মরিয়া হয়ে আক্রমণ শুরু করল, তখন তাদের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের। রাউন্ড অব থার্টি টুতে নবাগত কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে স্পেনের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ো যেমন জাদুকরী খেলা উপহার দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি শোবের এদিন হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিরোধ্য।

ম্যাচের ১৯ মিনিটে হাইসেম হাসান বক্সে ফাউল করলে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায়। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা লিওনেল মেসির সেই পেনাল্টি শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দেন শোবের। এটি ছিল চলতি আসরে মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস, এর আগে গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও তিনি পেনাল্টি মিস করেছিলেন। নিজের ছয়টি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৮টি পেনাল্টি শট নিয়ে ৪টিই মিস করেছেন এই মহাতারকা, যার দুটিই এলো এই আসরে। পেনাল্টি মিসের পর আর্জেন্টিনার ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ আরও ঘনীভূত হয়। এর চার মিনিট পর, ২৮ মিনিটে ম্যাক অ্যালিয়েস্টারের একটি নিশ্চিত বুলেটের মতো হেড দারুণ দক্ষতায় রক্ষা করেন শোবের। ৩১ মিনিটে মেসির একটি বাঁকানো ফ্রি-কিক মিসরের গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও তা সাইডপোস্টে লেগে বাইরে চলে যায়। ফলে প্রথমার্ধের পুরো নিয়ন্ত্রণ আর্জেন্টিনার হাতে থাকা সত্ত্বেও স্কোরবোর্ড বলছিল অন্য কথা। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় সালাহর মিশর।

দ্বিতীয়ার্ধে গোল পরিশোধের নেশায় আর্জেন্টিনা যখন আরও উন্মত্ত ও বেসামাল হয়ে আক্রমণ করতে শুরু করল, ঠিক তখন মিশরীয়দের মরণকামড়। রক্ষণভাগের ফাঁক গলে মিশরের কাউন্টার অ্যাটাকগুলো কাঁপন ধরাচ্ছিল আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে। এর মাঝেই আরেকটি গোল হলেও মার্তিনেজদের স্বস্তি দিয়ে মিসরের দ্বিতীয় গোলটি ভিআরের সূক্ষ্ম বিচারে বাতিল হয়। নিজ বক্স থেকে হাসান একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে পাস করেছিলেন আগুয়ান মোস্তফা জিকোকে, এবং জিকো চলতি বলেই এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অফসাইডের কারণে রেফারি তা বাতিল ঘোষণা করেন। তবে এই স্বস্তি বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।

ম্যাচের ৬৭ মিনিটে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে নামা মিসর ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। নিজেদের বক্স থেকে বাড়ানো বল ধরে দলের প্রধান তারকা মোহাম্মদ সালাহ ডান দিকে চমৎকারভাবে পাস দেন হাইসেম হাসানকে। হাসান ফাঁকা জায়গায় বল ঠেলে দিলে সেখানে ছুটে আসেন মোস্তফা জিকো। এবার আর কোনো ভুল করেননি এই স্ট্রাইকার, ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে ২-০ গোলের লিড এনে দেন মিসরকে। মেসিসহ পুরো আর্জেন্টিনা শিবির তখন অবিশ্বাস্য এক ঘোর ও অন্ধকারের মুখোমুখি। ইতিহাস আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ছিল, অতীত পরিসংখ্যানের কালো মেঘ ডানা মেলছিলÑ ২ গোলে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ জেতা আর্জেন্টিনার ডিএনএ-তে ছিল না। বিদায়ের ঘণ্টা তখন বেজে উঠেছে আকাশি-নীল শিবিরের জন্য। যখন সব আশা ফুরিয়ে আসছিল, তখনই জেগে উঠলেন ফুটবল জাদুকর। চাপের মুখে ভেঙে না পড়ে দলকে টেনে তোলার পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন কাপ্তান লিওনেল মেসি। পেনাল্টি মিসের মানসিক যন্ত্রণা ও টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হলোÑ আর্জেন্টিনার কাক্সিক্ষত ম্যাজিক। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা দুর্দান্ত বলে মাথা ছুঁইয়ে ব্যবধান ১-২ করেন রোমেরো। এই গোলটি কেবল ব্যবধানই কমায়নি, বরং আর্জেন্টিনার মৃতপ্রায় ধমনীতে নতুন রক্তের সঞ্চার করেছিল।

এর ঠিক চার মিনিট পর, ৮৩ মিনিটে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ডি-বক্সের ভেতর বল পেয়ে  লিওনেল মেসি তার চিরসবুজ বাঁ পায়ের এক শটে মিশরের রক্ষণ ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করে আর্জেন্টিনাকে ২-২ গোলের সমতায় ফেরান। পেনাল্টি মিস করে চরম চাপে থাকা মেসির এই গোলটি ছিল বিশ্বকাপে তার ২১তম গোল এবং চলতি আসরের ৮ম গোল। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৯টি অ্যাসিস্টের মালিকের এই গোলটি পুরো স্টেডিয়ামের আবহ বদলে দেয়। ম্যাচ যখন নির্ধারিত সময়ের গ-ি পেরিয়ে অতিরিক্ত সময়ে গড়াচ্ছিল, তখনই আসে চূড়ান্ত আঘাত। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে (৯২ মিনিট) এঞ্জো ফার্নান্দেজ চোখধাঁধানো হেডে ব্যবধান ৩-২ করেন। এই গোলটি কেবল আর্জেন্টিনার জয়ই নিশ্চিত করেনি, এটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৩০০০তম গোল। মাত্র ১৩ মিনিটের এই টর্নেডোতে সালাহদের ইতিহাস লেখার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

৫ গোলের এই থ্রিলার ম্যাচের শেষ দিকে ফুটবলারদের মাঝে কিছুটা উত্তেজনা ও বাগবিত-া ছড়ালেও তা ম্যাচের মূল ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। রেফারি যখন ম্যাচ শেষের চূড়ান্ত বাঁশি বাজালেন, তখন মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামের দৃশ্যপট পরাবাস্তব রূপ ধারণ করেছে। একটু আগেও যে মেসি বুকভরা চাপ আর পেনাল্টি মিসের গ্লানি নিয়ে লড়ছিলেন, তিনি রেফারি বাঁশি বাজাতেই দুই হাতে মুখ ঢেকে মাঠের মাঝে বসে পড়লেন। তবে এবার আর কষ্টের কান্না নয়, এ কান্না ছিল স্বস্তির, আনন্দের এবং এক পরম প্রাপ্তির। লাওতারো মার্টিনেজ, ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরোরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন তাদের প্রিয় কাপ্তানকে, সতীর্থরা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠলেন অধিনায়কের সঙ্গী হয়ে।

রাউন্ড অব থার্টি টুতে নবাগত কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ৩-২ গোলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের পর প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালেও একই ব্যবধানের এই জয় আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় চরিত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করল। আলবিসেলেস্তারা বিশ্বকে আরও একবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলÑ ফুটবলে শেষ মুহূর্ত বলে কিছু নেই, লড়াইয়ের মানসিকতা থাকলে যেকোনো পরিস্থিতি থেকেই বেঁচে ফেরা সম্ভব, এবং বুকভরা বিশ্বাস থাকলে সত্যিই এভাবেও ফিরে আসা যায়।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!