জনপ্রিয় মিউজিক স্ট্রিমিং অ্যাপ স্পটিফাই একসময় কেবল গান শোনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছে পডকাস্ট এবং অডিওবুক। তবে সম্প্রতি কোম্পানিটি যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ফিচার যুক্ত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বেশ বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কোম্পানির ‘ইনভেস্টর ডে’ অনুষ্ঠানে ঘোষিত নতুন ফিচারগুলোর মূল লক্ষ্য ব্যবহারকারীদের পছন্দের কনটেন্ট খুঁজে পেতে সাহায্য করা নয়, বরং এআই দিয়ে নতুন কনটেন্ট তৈরি করা।
কনটেন্টের সুনামি ও নতুন সংকট
এতদিন পর্যন্ত স্পটিফাই ছিল মানুষের তৈরি গান ও পডকাস্ট শোনার জায়গা। কিন্তু এখন এআই-চালিত টুল নিয়ে আসার কারণে পুরো প্ল্যাটফর্মের চেহারা বদলে যেতে চলেছে। এর ফলে একটি বড় সংকট তৈরি হয়েছেÑ মানুষ যে গতিতে গান তৈরি করে, এআই এখন তার চেয়ে অনেক দ্রুত গান তৈরি করতে পারছে, যা সামলানো স্পটিফাই-এর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত বছর এআইর তৈরি গান সঠিকভাবে চিহ্নিত না করার কারণে স্পটিফাই সমালোচনার মুখে পড়েছিল। সেই ধাক্কা সামলে তারা আন্তর্জাতিক ‘উউঊঢ’ স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ করলেও, সম্প্রতি ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে শ্রোতারা জনপ্রিয় গানগুলোর এআই কভার এবং রিমিক্স তৈরি করতে পারবেন। এতে শিল্পীরা রয়্যালটি পেলেও, প্ল্যাটফর্মে এআই গানের বন্যা বয়ে যাবে, যা নতুন ও উদীয়মান মানব শিল্পীদের গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানো আরও কঠিন করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অডিওবুক ও পডকাস্টেও এআই
স্পটিফাই এআই ভয়েস কোম্পানি ‘ইলেভেনল্যাবস’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন টুল এনেছে, যার মাধ্যমে লেখকরা নিজেদের অডিওবুক মানুষের কণ্ঠের পরিবর্তে এআই কণ্ঠ দিয়ে তৈরি করতে পারবেন। তবে এই এআই কণ্ঠ অনেক সময় বেশ কৃত্রিম ও যান্ত্রিক শোনায়।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো স্পটিফাইর নতুন প্রোডাক্টিভিটি পুশ বা কর্মদক্ষতা বাড়ানোর ফিচার। তাদের ‘পার্সোনাল পডকাস্ট’ ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রতিদিনের ক্যালেন্ডার বা ই-মেইলের সারসংক্ষেপও এআইর কণ্ঠে পডকাস্ট আকারে শুনতে পারবেন। এখন সাধারণ ব্যবহারকারীরাও অ্যাপের ভেতরে সরাসরি প্রম্পট লিখে এই ব্যক্তিগত পডকাস্ট তৈরি করার সুবিধা পাচ্ছেন।
ডেস্কটপ অ্যাপ ও ‘এজেন্টিক এআই’র ইঙ্গিত
স্পটিফাই একটি পরীক্ষামূলক ডেস্কটপ অ্যাপও উন্মুক্ত করছে যা ব্যবহারকারীর ইমেল, নোট এবং ক্যালেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং একটি ব্যক্তিগত দৈনিক অডিও ব্রিফিং বা সারসংক্ষেপ তৈরি করবে। অ্যাপটির বিবরণী থেকে স্পষ্ট যে স্পটিফাই এখন ‘এজেন্টিক এআই’র দিকে ঝুঁকছেÑ এমন সফটওয়্যার যা শুধু প্রশ্নের উত্তর দেয় না, বরং মানুষের হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করে দিতে পারে।
সমাধান যখন নিজেই এক সমস্যা
এতসব ফিচারের কারণে প্ল্যাটফর্মে কনটেন্টের পরিমাণ আকাশচুম্বী হচ্ছে, আর তা সামাল দিতে স্পটিফাই আবারও এআই-এরই দ্বারস্থ হচ্ছে। পডকাস্ট এবং অডিওবুক সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য তারা গুগল সার্চের মতো ন্যাচারাল-ল্যাঙ্গুয়েজ ডিসকভারি বা কথোপকথনমূলক সার্চ ব্যবস্থা যুক্ত করছে। এখন ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট কোনো পডকাস্টের পর্ব বা এর মূল বিষয়বস্তু নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে পারবেন, যাতে তাদের চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো অন্য কোনো অ্যাপে যেতে না হয়।
বিশ্লেষকদের মতামত
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সব ধরনের অডিওর একমাত্র ঠিকানা বা ‘এভরিথিং-অডিও অ্যাপ’ হওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতায় স্পটিফাই এমন সব ফিচারে অ্যাপটি ভরিয়ে তুলছে যা হয়তো সাধারণ ব্যবহারকারীরা কখনোই চাননি। স্পটিফাই এখন আর শুধু কনটেন্ট উপভোগ করার জায়গা নয়, বরং ব্যবহারকারীদের নিজেদের কনটেন্ট তৈরি করার জন্য উৎসাহিত করছে। অ্যাপের এই জটলা ও জটিলতা সামলাতে গিয়ে ব্যবহারকারীরা যদি অন্য ভালো কনটেন্ট বা নতুন সৃষ্টিকর্তাদের আবিষ্কার করার সুযোগই না পান, তবে স্পটিফাই তার মূল আকর্ষণ ও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে পারে। শ্রোতারা যদি তাদের কাক্সিক্ষত কনটেন্ট সহজে খুঁজে না পান, তবে অনেকেই এই অ্যাপ ছেড়ে অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যেতে পারেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন