× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আল্লামা শফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ১০:৪২ এএম

হিংসা থেকে বাঁচার কুরআনিক আলোকবর্তিকা

আল্লামা শফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ১০:৪২ এএম

হিংসা থেকে বাঁচার  কুরআনিক আলোকবর্তিকা

মানুষের অবয়ব সুন্দর, কিন্তু তার ভেতরের জগতটি যদি কলুষিত হয়, তবে সেই সুন্দরের কোনো মূল্য থাকে না। ইসলাম কেবল বাহ্যিক ইবাদতের সমষ্টি নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও অন্তরের পরিচ্ছন্নতার এক পরম কানন। এই অন্তরের যতগুলো মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক রোগ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম এবং শীর্ষস্থানীয় হলো হিংসা ও বিদ্বেষ। এটি এমন এক নীরব ঘাতক, যা মানুষের অজান্তেই তার পুণ্য খাতা শূন্য করে দেয়, সমাজকে করে তোলে কলুষিত এবং মানুষের আত্মিক প্রশান্তি কেড়ে নেয়। যান্ত্রিক এই সভ্যতায় মানুষের বস্তুগত উন্নতি যত বাড়ছে, অন্তরের এই ব্যাধিটি যেন ততটাই ডালপালা মেলছে। অথচ একজন মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার হৃদয় হবে সংকীর্ণতাহীন, ভালোবাসায় সিক্ত এবং হিংসা-বিদ্বেষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

দুনিয়ার হাকিকত

পবিত্র ইসলাম আমাদের যে সমাজব্যবস্থার শিক্ষা দেয়, তার ভিত্তি হলো পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব। মহান আল্লাহ তাআলা মুমিনদের আদেশ করেছেন তারা যেন ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের সাথে বসবাস করে। তিনি ইরশাদ করেছেন:

“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১০)

এই চিরন্তন বাণীর মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের রক্ত সম্পর্কের চেয়েও এক শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের, যেকোনো ভাষার বা বর্ণের মানুষ হোক না কেন, ইমানের সুতোয় তারা সবাই এক সুবিন্যস্ত মালা। এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ করেছেন:

“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু।” (সূরা তাওবাহ, আয়াত: ৭১)

যখন এই বন্ধুত্বের প্রাচীরে হিংসার ফাটল ধরে, তখন পুরো সমাজ ভেঙে পড়ে। হিংসা মূলত আল্লাহর ফয়সালার প্রতি এক ধরনের অঘোষিত অসন্তুষ্টি। আল্লাহ যখন কাউকে ধন-সম্পদ, জ্ঞান বা মর্যাদা দান করেন, তখন অন্য কারও মনে তা দেখে যে ঈর্ষা বা সেই নেয়ামত ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, সেটাই হিংসা। শয়তান মানুষের অন্তরে এই কুমন্ত্রণা দিয়ে মূলত আল্লাহর হিকমতের ওপর প্রশ্ন তুলতে শেখায়।

হিংসার ভয়াবহতা

প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর উম্মতকে প্রতিটি আত্মিক ব্যাধি থেকে সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে এমন আচরণকে তিনি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ করো না, পরস্পর অহংকার করো না, পরস্পর হিংসা করো না এবং একে অপরের পেছনে শত্রুতা করো না। আর হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ভাই ভাই হয়ে যাও।”

মুমিনদের এই ভ্রাতৃত্ববোধ কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক পরম অনুভূতির নাম। একজন মুমিনের সুখে অন্য মুমিন আনন্দিত হবে, আর তার কষ্টে অন্য মুমিনের চোখ অশ্রুসজল হবেÍএটাই ইসলামের দাবি। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুমিনদের এই একাত্মতাকে এক অপূর্ব উপমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন:

“মুমিনগণ একটি দেহের মতো; যদি তার চোখে কষ্ট হয় তবে সারা শরীর তা অনুভব করে, আর যদি মাথায় কষ্ট হয় তবে পুরো শরীরই তা অনুভব করে।”

হিংসা মানুষের আমলনামাকে কীভাবে নিঃশেষ করে দেয়, তার এক অমোঘ চিত্র এঁকেছেন মহানবী (সা.)। তিনি আমাদের সতর্ক করে বলেছেন:

“তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো, হিংসা নেক আমলগুলোকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।”

শুকনো কাঠে আগুন লাগলে যেমন তা নিমেষেই ছাই হয়ে যায়, ঠিক তেমনি একজন মানুষের রাত জেগে করা ইবাদত, দান-সদকা ও সৎ কাজগুলো হিংসার আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যায়। হিংসুক ব্যক্তি আসলে নিজের অজান্তেই নিজের আখেরাত ধ্বংস করে বসে।

হিংসার বহুমুখী ক্ষতি

ইসলামের দৃষ্টিতে হিংসা কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়, এটি একটি সামাজিক ক্যানসার। এর ক্ষতি বহুমাত্রিক:

হৃদ্যতার বন্ধন ছিন্ন হওয়া: হিংসা মানুষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ও ভালোবাসাকে রাতারাতি শত্রুতায় রূপান্তরিত করে।

মানসিক অশান্তি: হিংসুক ব্যক্তি কখনই শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। অন্য মানুষের উন্নতি দেখে সে প্রতিনিয়ত ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকে।

নেক আমল ধ্বংস হওয়া: কোনো প্রতিদান ছাড়াই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয় তথা পুণ্যসমূহ মুছে যায়।

আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া: যে অন্তরে হিংসা ও ঘৃণা থাকে, সেখানে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমতের আলো প্রবেশ করতে পারে না।

শয়তানের প্রথম পাপই ছিল হিংসা ও অহংকার। আদম (আ.)-কে আল্লাহ মর্যাদা দেওয়ায় শয়তান তা সহ্য করতে পারেনি। তাই হিংসার পথ ধরে যে হাঁটে, সে আসলে শয়তানের পদাঙ্কই অনুসরণ করে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এই মানসিকতার নিন্দা করে বলেছেন:

“নাকি তারা মানুষকে সেই কারণে হিংসা করে যা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের দান করেছেন?” (সূরা নিসা, আয়াত: ৫৪)

বাঁচার উপায়

হিংসা ও বিদ্বেষের এই ধ্বংসাত্মক থাবা থেকে বেঁচে থেকে অন্তরকে কালিমামুক্ত করার জন্য ইসলাম আমাদের অত্যন্ত কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত কিছু প্রেসক্রিপশন দিয়েছে। এগুলো অনুসরণের মাধ্যমে আমরা আমাদের অন্তরকে জান্নাতি অন্তরে রূপান্তর করতে পারি।

১. সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটানো

পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি ও অহংকার দূর করার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম হলো সালাম। সালাম কেবল একটি অভিবাদন নয়, এটি পরস্পরের জন্য শান্তির দোয়া। রহমত ও দয়ার নবী (সা.) এর কথা স্মরণ করুন:

“তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না ইমান আনবে, আর তোমরা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন একটি জিনিসের কথা বলব না যা করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।”

২. উপহার আদান-প্রদান করা

মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। সামান্য উপহার অনেক বড় দূরত্বের দেয়াল ভেঙে দিতে পারে। উপহার দিলে অন্তরের সংকীর্ণতা দূর হয় এবং অপর ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেছেন:

“তোমরা পরস্পরকে উপহার দাও, এতে অন্তরের বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে।”

৩. তকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা

কাউকে কোনো নেয়ামত পেতে দেখলে এই বিশ্বাস রাখা যে, এটি আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় তাকে দান করেছেন। আল্লাহর ফয়সালাকে মনে-প্রাণে মেনে নিলে হিংসার উৎপত্তিই হতে পারে না। অন্যের কল্যাণে আনন্দিত হওয়া এবং নিজের জন্য আল্লাহর কাছে উত্তম রিযিক প্রার্থনা করাই মুমিনের কাজ।

৪. হিংসিতের জন্য গোপনে দোয়া করা

যার প্রতি মনের ভেতর হিংসা বা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তার জন্য নির্জনে আল্লাহর কাছে কল্যাণের দোয়া করা। হাদিস অনুযায়ী, যখন কেউ তার ভাইয়ের জন্য গোপনে দোয়া করে, তখন ফেরেশতারা বলে, ‘আমীন, তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।’ এই আমলটি অন্তরের সব বিষাক্ততা ধুয়ে দেয়।

পরিচ্ছন্ন অন্তরেই পরম মুক্তি

হিংসা থেকে মুক্ত অন্তরই হলো দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্যের চাবিকাঠি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, শ্রেষ্ঠ মানুষ কে? তিনি বলেছিলেন, “যার অন্তর পরিচ্ছন্ন এবং জবান সত্যবাদী।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, পরিচ্ছন্ন অন্তরের অর্থ কী? তিনি বললেন, “যে অন্তরে কোনো পাপ নেই, অন্যায় নেই, খেয়ানত নেই এবং হিংসা-বিদ্বেষ নেই।”

অতএব, আমাদের জীবনের এই ক্ষণস্থায়ী প্রহরে হিংসার মতো আত্মঘাতী ব্যাধি পুষে রেখে লাভ কী? আসুন, আমরা আমাদের অন্তর থেকে সমস্ত ঘৃণা ও বিদ্বেষ বর্জন করি এবং ভালোবাসা ও হৃদ্যতার সাথে জীবনযাপন করি। আল্লাহ আমাদের জন্য কোরআনের মাধ্যমে বরকত দান করুন। কোরআনের আয়াত ও হিকমতপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে আমাদের ও আপনাদের উপকৃত করুন। আল্লাহর কাছে আমার জন্য, আপনাদের জন্য ও সকল মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারা তাঁর কাছে ক্ষমা চান, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু। আমীন।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!