বর্তমান সময়ে একশ্রেণির বিশেষ মতাদর্শপ্রভাবিত আবেগপ্রবণ তরুণ সমাজ ‘গাজ্ওয়াতুল হিন্দ’ বা ‘হিন্দুস্তানের যুদ্ধ’ বিষয়ক নানা বর্ণনা ও প্রচারণাকে কেন্দ্র করে প্রবল উন্মাদনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।
সমাজ পরিবর্তনের রোমাঞ্চকর স্বপ্ন ও আবেগঘন কল্পনা তাদের অনেককেই বাস্তবতা, প্রজ্ঞা ও শরয়ী ভারসাম্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
অথচ মানবসমাজে পাপাচার, অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নিপীড়ন এবং ধর্মহীনতার অস্তিত্ব চিরকালই ছিল, আজও রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়Ñ সত্যপন্থিদের সংখ্যা সবসময়ই বাতিলপন্থিদের তুলনায় কম ছিলো। ফলে দীনদার, বিশেষত আবেগী যুবসমাজ, সমাজের অনাচার দূর করে একটি আদর্শ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইলম, দাওয়াত, তাবলিগ, আত্মশুদ্ধি ও ধৈর্যের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের পথ দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। আর ঠিক এই কারণেই ‘গাজ্ওয়াতুল হিন্দ’ কিংবা ‘ইমাম মাহদীর আবির্ভাব’-সংক্রান্ত আলোচনাগুলো বহু আবেগপ্রবণ মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর বলে প্রতীয়মান হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট হাদিসসমূহের বিশুদ্ধতা, ব্যাখ্যা, প্রেক্ষাপট ও উলামায়ে মুহাক্কিকীনের বিশ্লেষণ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন না করেই আবেগের বশবর্তী হয়ে বিভ্রান্তির পথে পা বাড়াচ্ছে। কেউ কেউ তথাকথিত ‘জিহাদ’-এর নামে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদমূলক কর্মকা-েও জড়িয়ে পড়ছে।
এর ফলস্বরূপ অগণিত তরুণের মহামূল্যবান জীবন অকারণে অন্ধকার কারাগারে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে; একই সঙ্গে কলঙ্কিত হচ্ছে ইসলামের শান্তিময়, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশোভিত ভাবমূর্তি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ইঔচ থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতার চেয়ার দখল করার পর থেকে এবং অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতে মুসলিম নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে ‘হরকাতুল জিহাদ’ ও ‘আনসারু গাজ্ওয়াতিল হিন্দ’ বা ভারতীয় উপমহাদেশে যুদ্ধের বিষয়টি মূলত ইসলামি চরমপন্থি গোষ্ঠী, জঙ্গি সংগঠন এবং কিছু নির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুসারীদের দ্বারা প্রচারিত ও আকাক্সিক্ষত একটি বিষয়।
গবেষণা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, মূলত: নিচের গোষ্ঠীগুলো গাজ্ওয়াতুল হিন্দ চায়:
যারা এই ধারণার প্রচার বা সমর্থন করে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ইসলামি জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী: এর মতো আল-কায়েদার মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন (যেমন- লস্কর-ই-তয়্যেবা) এই ধারণাকে ব্যবহার করে জম্মু-কাশ্মীর ও ভারতে জিহাদ বা যুদ্ধের আহ্বান জানায়।
উগ্রপন্থি মতাদর্শীরা : উপমহাদেশে, বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কিছু কট্টরপন্থি প্রচারক এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় কতিপয় গোষ্ঠী এই যুদ্ধের বাণী প্রচার করে এবং বিশ্বাস করে যে , এই যুদ্ধে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয় হবে। রাজনৈতিক সস্তা জনপ্রিয়তা: দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা গোষ্ঠী ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগাতে এই ‘গাজ্ওয়াতুল হিন্দ’-এর ভাষ্যটি ব্যবহার করে থাকে। উপরিউক্ত সংগঠনগুলোর তৎপরতা এ বাস্তবতারই করুণ বহির্প্রকাশ।
এমনকি তারা অনেক সময় সম্মিলিতভাবে তথাকথিত ‘গাজ্ওয়াতুল হিন্দ’-এর প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বানও জানিয়ে থাকে।
এমতাবস্থায় ইমান ও দীনকে বিভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করতে ‘গাজ্ওয়াতুল হিন্দ’ সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহের বিশুদ্ধতা, সঠিক ব্যাখ্যা ও আকিদাগত অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলাম এক অনন্ত প্রাণশক্তিসম্পন্ন, সার্বজনীন ও কালোত্তীর্ণ জীবনব্যবস্থাÑ যার আলো ভৌগোলিক সীমারেখা, জাতিগত বিভাজন ও সভ্যতার প্রাচীর ভেদ করে যুগে যুগে মানবসমাজের প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি গৃহে এবং প্রতিটি হৃদয়ে পৌঁছে গেছে। বিশ্বমানবতার মুক্তি, ন্যায়, সাম্য ও শান্তির সুমহান বাণী নিয়ে আবির্ভূত এই মহিমান্বিত দীনকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যে মহানবী তাঁর উম্মাতকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন এই বলেÑ আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও পৌঁছে দাও।’ এই সংক্ষিপ্ত অথচ সুদূরপ্রসারী নববাণী সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে এমন গভীর প্রেরণার সঞ্চার করেছিল যে, তাঁরা নিজেদের জীবন, সম্পদ ও সাধনাকে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের মহান ব্রতে অকাতরে উৎসর্গ করেছিলেন।
ফলে রাসুলুল্লাহ-এর ইন্তেকালের পর ইসলামি খেলাফতের সুবর্ণযুগে ইসলামের বিজয়যাত্রা দ্রুততর হতে থাকে।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, ন্যায়পরায়ণ শাসক ওমর ইবনুল খত্তব (রদিইয়াল্লাহু আনহু) অর্ধ পৃথিবীতে ইসলামের আলোকরশ্মি বিস্তার করেও তৃপ্ত হননি; বরং তাঁর হৃদয়ে ছিলো সমগ্র মানবজাতির নিকট ইসলামের শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অদম্য আকাঙক্সক্ষা।
সেই বিশ্বব্যাপী দাওয়াতি চেতনার ধারাবাহিকতায় তৃতীয় খলিফা উসমান (রাদি.) সুদূরচীনের সম্রাটের দরবারে ইসলামের প্রতিনিধি প্রেরণ করেন।
অতঃপর মুসলিম দাঈ, মুজাহিদ, ব্যবসায়ী ও সাধকগণ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের সুমহান বাণী বিশ্বব্যাপী বিস্তার করতে থাকেন।
ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্থানেও ইসলামের দাওয়াত অত্যন্ত প্রাচীনকালেই পৌঁছে যায়। বিশেষত হিন্দ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ-এর কিছু ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বর্ণনা মুসলমানদের অন্তরে এ অঞ্চলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল। ফলে আমিরে মু‘আবিয়া (রাদি.)-এর যুগে সাহাবি ও তাবেঈগণ ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন। পরবর্তীকালে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের ঐতিহাসিক অভিযান এবং সুলতান মাহমুদ গযনীর ধারাবাহিক বিজয়ের মাধ্যমে হিন্দুস্থানে মুসলিম শাসনের ভিত সুদৃঢ় হয়। দীর্ঘ প্রায় আট শতাব্দী মুসলমানগণ এ ভূখ-ে শাসন পরিচালনা করেন এবং জ্ঞান, সংস্কৃতি, ন্যায়বিচার ও সভ্যতার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করেন।
কিন্তু মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতিতে ১৭৫৭ সালে ইংরেজ উপনিবেশবাদীদের হাতে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে !
পরবর্তীকালে দীর্ঘ দুই শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসন শেষে ভারতবর্ষের বৃহৎ অংশ পুনরায় হিন্দু নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে চলে যায়।
এমন ঐতিহাসিক ও আবেগঘন প্রেক্ষাপটে ‘গাজ্ওয়াতুল হিন্দ’ বা ‘হিন্দুস্থানের যুদ্ধ’ শীর্ষক কিছু হাদিসকে কেন্দ্র করে বর্তমান যুগে এক শ্রেণির বিভ্রান্ত (কওমি) যুবসমাজ চরম ভুল ধারণায় নিমজ্জিত হয়েছে।
তারা মনে করে, বর্তমান ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করলেই হাদিসে ঘোষিত বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা অর্জিত হবে।
অথচ হাদিসসমূহের যথার্থ প্রেক্ষাপট, বিশুদ্ধতা ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই তারা আবেগতাড়িত হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী ও ইসলামবিরোধী নানা কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকে অর্থ, মেধা ও সম্ভাবনাময় জীবনকে বিপথে নষ্ট করছে; কেউ বা উগ্র চিন্তার বলি হয়ে অকালে জীবন বিসর্জন দিচ্ছে।
বিষয় এই যে, জান্নাত লাভের অসংখ্য সুস্পষ্ট, সহজ ও শরিয়তসম্মত পথ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তারা সেগুলোর প্রতি উদাসীন থেকে বিভ্রান্তিকর আবেগের পেছনে ছুটে চলেছে।
প্রশ্ন জাগেÑ কেন এই বিপজ্জনক মোহে আবদ্ধ হচ্ছে একদল তরুণ? কোন্ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তারা এমন ধারণা পোষণ করছে? প্রকৃতপক্ষে হাদিসসমূহের অপব্যাখ্যা ও খ-িত উপলব্ধিই তাদের এই বিভ্রান্তির মূল উৎস।
অতএব ‘গাজ্ওয়াতুল হিন্দ’ সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোর সনদ, মান, প্রেক্ষাপট ও প্রকৃত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি। নি¤œবর্তী আলোচনায় ইনশাআল্লাহ এ বিষয়ে আমি প্রামাণ্য ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে সত্যকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হব।
গাজ্ওয়াতুল হিন্দ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসসমূহের পর্যালোচনা :
গাজ্ওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায়। তবে মুহাদ্দিসগণের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এগুলোর অধিকাংশই অত্যন্ত দুর্বল অথবা জাল। কেবল অল্প কিছু বর্ণনা আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে রয়েছে।
লেখক : তাফসির-কারক, রমজানে সেহরি অনুষ্ঠান পরিচালনা-সহ ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভাষ্যকার : বাংলাদেশ বেতারে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্বারি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন