ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

৪৫৩ কোটি টাকার প্রকল্প সিন্ডিকেটের কবজায়

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫, ০১:৩২ এএম
বাঁশখালী বেড়িবাঁধ। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

চট্টগ্রামের দক্ষিণে বাঁশখালী উপজেলার বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী লক্ষাধিক মানুষের জানমাল রক্ষা ও বেড়িবাঁধে ভাঙন রোধে ২০২৪ সালের ২৮ মে নেওয়া ৪৫৩ কোটি টাকার প্রকল্প সিন্ডিকেটের কবজায়। প্রকল্প ঘিরে চলছে দারুণ অনিয়ম। এর মধ্যে উপজেলার ছনুয়া উপকূলের ১০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ হাজার আটশ মিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড ও প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের যৌথ মালিকানাধীন ছয়টি প্যাকেজ কুতুবদিয়া চ্যানেল বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি দিয়ে বানানো হচ্ছে বাঁধের সিসি ব্লক। অপরদিকে সিসি ব্লকে সিলেটি বালুর পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের স্থানীয় (বেতাগী) বালু ও ময়লাযুক্ত পাথর। এতে হুমকির মুখে পড়েছে ১০৭ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্প।

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গঠিত ছনুয়ায় ৯টি গ্রুপ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। কাজগুলো বাগিয়ে নেন মো. হোসাইনের ‘আল ইমরান এয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ বালু সাপ্লাই ও লেবার কাস্টিং ১টি মেশিন, আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে দুইটি মেশিন, রাবেয়া সাপ্লায়ারের পক্ষে আবদুল হাকিম ও জাকের ১টি, হাজী ট্রেডার্সের পক্ষে মো. মনজুর ১টি, জসিম ১টি, জোনাইদ ও ইসলাম ১টি, মামুন ১টি, কাইছার ১টি, ফজলুল কাদেরের নেতৃত্বে ১টি মেশিন থাকলেও তিনি কাজ শুরু করতে পারে নাই। মালামালসহ যাবতীয় লোড-আনলোডের কাজ পরিচালনা করেন জাকের ও কাইছার।

সরেজমিনে বাঁশখালীর ছনুয়া বেড়িবাঁধ প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি দিয়ে বলগেট থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে স্থানীয় বেতাগী ও সিলেটি বালু আনলোড করা হয়েছে। সিলেটি বালু ছাড়া শুধু স্থানীয় বেতাগী বালু দিয়ে চলছে সিসি ব্লকের কাজ। একই সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে অধিক ময়লাযুক্ত নিম্নমানের পাথর। পাউবো কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে সিসি ব্লকের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। 

‘খানখানাবাদ’ কদমরসুলে ১৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে তেরশ মিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণকাজ রাজনৈতিকভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চাপ দিয়ে যাবতীয় সাপ্লায়ার হিসেবে কাজ পরিচালনা করেন মেসার্স থ্রি পয়েন্টের পক্ষে স্থানীয় মো. আরিফ, রেজাউল করিম ও খানখানাবদ ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম। অপরদিকে তালুকদার ট্রেডিং বালি সাপ্লায়ার হিসেবে কাজ করছেন কাইদুল ওয়াদুদ, আশরাফ ও শাহেদ। সিনবাদ জেনারেল ট্রেডিংয়ের হান্নান। তাদের নিজেদের রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে কাজের গতি খুবই কম।

সাধনপুরে ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর তীর সংরক্ষণকাজ এগারশ মিটারের মধ্যে ৭৫০ মিটার সিসি বল্ক ক্যাস্টিং ও জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজও বাগিয়ে নিয়েছেন- ওয়াহিদ উদ্দিন চৌধুরী, আঁখি এন্টারপ্রাইজের ইউসুফ, পল্লীমাতা সোসাইটির সরওয়ার, সিনবাদ জেনারেল ট্রেডিং ফারুক, রয়েল ট্রেডিং হান্নান, আক্তার, ফারুকী অ্যান্ড ব্রাদার্স, আবদুল হান্নান ও নুর উদ্দীন।

স্থানীয়রা জানান, ব্লক তৈরিতে নিম্নমানের পাথর ও লবণাক্ত বালি ব্যবহার, এ ছাড়া বল্ক তৈরির পর ভাইব্রেটর মেশিন ব্যবহার না করা ও পরবর্তীতে তৈরীকৃত ব্লকে পানি না দেওয়া, ব্লক তৈরির সময় পাউবো কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির কারণে না না অনিয়ম সংঘটিত হওয়ায় ব্লকগুলো বসানোর সময় ভেঙে যায়। অতি স্বল্প সময়ে ব্লকগুলো খসে নষ্ট হয়ে যায়।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ২৮ মে বাঁশখালীর উপকূল রক্ষায় সাত হাজার ৫১০ মিটার কাজ ছয়টি অংশে বিভক্ত করে ৪৫৩ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে পাস হয়। তার  মধ্যে ছনুয়ায় ১০৭ কোটি টাকার প্রকল্পে ২৮০০ মিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজের চলমান রয়েছে। ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজের মেয়াদ রয়েছে। অপরদিকে খানখানাবাদ কদমরসুল ১৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ, সাধনপুরে নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ ১১০০ মিটারের মধ্যে এর ৭৫০ মিটার কাজ চলমান থাকলে ও রাজনৈতিক অন্তর্কোন্দলের কারণে বাকি ৩৫০ মিটার, খানখানাবাদের অপর অংশে ৭২০ মিটার, বাহারছড়ায় ১ হাজার মিটার মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্সের কাজ

তিনটা প্যাকেজেই বক ক্যাস্টিং শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে খানখানাবাদে জিরো পয়েন্টে ৫৯০ মিটার জামিল ইকবালের কাজ এরই মধ্যে চালু করা হয়েছে। 

ছনুয়া উপকূলের বাঁধ নির্মাণকাজে দায়িত্বে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ম্যানেজার মিরাজ বলেন, ‘পাথর ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট আমাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে সরাসরি দেওয়া হয়। প্রথমদিকে আমরা বালু গ্রহণ না করার পরও স্থানীয় ওই সিন্ডিকেট জোরপূর্বক বালু আনলোড করেছে। আমরা বালু গ্রহণ করিনি।’ বেতাগী বালু দিয়ে সিসি ব্লক বানানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই বালু ভালো মানের। আমরা নিজেরা বালু আনলোড করতে চাইলে দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত আমরা বাধার সম্মুখীন হচ্ছি।’

খানখানাবাদের এলাকার নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জানান, ‘বিগত সময় সিসি ব্লকের জন্য আনা বালু প্রতিদিন বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি দিয়ে আনলোড করা হয়েছে। এলাকাবাসী প্রতিবাদ করলেও কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছেন না ঠিকাদার ও সাপ্লায়ার। উল্টো বিভিন্নভাবে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখানো হচ্ছে। বিগত সময়ে দিনে আনলোড করলেও মানুষের চোখ এড়াতে এখন রাতের অন্ধকারে এই কাজ করা হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন মালামাল সাপ্লায়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা শতকোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্পে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছেন। আমরা এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করি।’

জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএল-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিগত সময়ে স্থানীয় কিছু মানুষ জোরপূর্বক বালু আনলোড করেছে, আমরা অনেকের বালু গ্রহণ করিনি। আমাদের প্রতিটি সাইটে গভীর নলকূপ স্থাপন করেছি। নলকূপ ও পুকুরের পানি দিয়ে বালু আনলোড করা হবে।’ ছনুয়ায় স্থানীয় বেতাগী বালু দিয়ে সিসি ব্লক বানানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই বালু প্রথমদিকে জোরপূর্বক দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে তাদের বালি নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কোম্পানির পক্ষ থেকে সিলেটি বালুর বলগেট আনা হয়েছে। আমরা শ্রমিক দিয়ে করে আনলোড করেছি। আমরা সিলিং বালি যেটা নদীর ড্রেসিং করি, মাঠের জন্য সে গুলো আমরা ড্রেজার দিয়ে নিয়ে আসছি। পাথরগুলো আমরা দুবাই থেকে ইনপুট করেছি। এগুলো বুয়েট এবং চুয়েট থেকে টেস্ট হয়। বাঁশখালীতে ইতিপূর্বে এই রকম পাথর দিয়ে আর কাজ হয় নাই। আমরা দুবাই থেকে ম্যাসুয়েল টেস্ট করে পাথরগুলো এনেছি।’

পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, ‘লবণাক্ত পানি দিয়ে যে বালু আনলোড করা হয়েছিল ওইগুলো আমরা পূর্বেই বাতিল করেছি। সব জায়গায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। সার্বক্ষণিক আমরা নজর রাখছি। সবগুলো প্যাকেজেই তো ব্লক কাস্টিং চলতেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্লকগুলো বুয়েট থেকে টেস্ট করে মান যদি ভালো না হয় আর্থিকভাবে ঠিকাদারের ক্ষতি। কারণ টেস্টে খারাপ এলে পরবর্তী সময়ে পুনরায় বল্ক তৈরি করে দিতে হবে। খানখানাবাদে ঠিকাদারকে কাজ করতে দিচ্ছে না ওই সিন্ডিকেট গ্রুপ। কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। তারা কাস্টিং করবে বলে বলে একেকজনে একেকটা মেশিন নিয়ে বসে আছে। ঠিকাদারকে বাইরে থেকে লেবার আনতে দিচ্ছে না। প্রথমে বালি নিয়ে ও এ রকম সমস্যা করেছিল। তাদের গ্রুপিংয়ের কারণে কাজের গতি খুবই স্লো। তারা নিজেরাও করতেছে না, ঠিকাদারকেও করতে দিচ্ছে না। সব জায়গায় আসলে বাধার সম্মুখীন হচ্ছি।’