বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে দলীয় অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠকের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সাংগঠনিক কাঠামো আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে মহানগর পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের নির্দেশনা এসেছে। এর অংশ হিসেবে উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপিকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি চলছে।
বিএনপির নয়াপল্টন ও গুলশান অফিসের সূত্রমতে, খুব শিগগির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে, যার কারণে উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতারা শীর্ষ পদে দায়িত্বে আসতে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি পদে আলোচনায় যারা
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি পদে সবচেয়ে আলোচিত নাম এস এম জাহাঙ্গীর। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এবং তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ থাকায় তিনি এগিয়ে রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তার পাশাপাশি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে উত্তর বিএনপির পরিচিত মুখ কাউন্সিলর আনারুজ্জামান আনোয়ার। সংগঠক হিসেবে মাঠে সক্রিয়তা এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বিএনপি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর বিএনপির পরিচিত মুখ কাউন্সিলর আনারুজ্জামান আনোয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের চাওয়া দলের চেয়ারম্যান যাকে যোগ্য মনে করবেন তাকেই শীর্ষ পদে রাখবেন। তবে এ ক্ষেত্রে ত্যাগী, দক্ষ সাংগঠনিক ও যোগ্যরা উত্তর বিএনপিতে এলে দলের শক্তি বাড়বে।’
উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় যারা
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে এগিয়ে রয়েছেন শামসুর রহমান শামসুর। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকার কারণে আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে তার অভিজ্ঞতা তাকে এগিয়ে রেখেছে। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন জগলুল পাভেল পাশা। বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হওয়ায় তার প্রতি দলের সহানুভূতিশীল অবস্থান রয়েছে, যা তাকে এই পদের দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
জানতে চাইলে উত্তর বিএনপির নেতা ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী শামসুর রহমান বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পেলে অবশ্যই দলকে সাংগঠনিকভাবে সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করব।’
দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি পদে আলোচনায় যারা
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি পদে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন বর্তমান জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না। মুন্নাকে সবাই দক্ষিণ বিএনপিতে দেখতে চান বলে দলীয় বিশেষ সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মোনায়েম মুন্না কেন্দ্রীয় শীর্ষ যুবদলের দায়িত্বরত অবস্থায় দলের মধ্যে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাকে এই পদে বেশ এগিয়ে রেখেছে।
দক্ষিণ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সভাপতির পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাবেক কাউন্সিলর হারুনুর রশিদ হারুন। হারুন দলের নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে বিভিন্ন মহলে বেশ পরিচিত। এ ছাড়া দলের হাইকমান্ড তাকে বেশ পছন্দ করেন। সূত্র বলছে, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও মাঠ পর্যায়ের সক্রিয়তার কারণে এর মধ্যে হারুন কমিশনার সভাপতি পদের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাবেক কাউন্সিলর হারুনুর রশিদ হারুন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, দল চাইলে দক্ষ সাংগঠনিক যারা, তাদের সামনে আনতে পারে।
এ ছাড়া সভাপতির একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন। এ পদে বেশ এগিয়ে রয়েছেন ঢাকা-৭ আসনের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হামিদুর রহমান হামিদ।
দলীয় সূত্রের দাবি, এই দুজনের মধ্যে রবিন তুলনামূলকভাবে কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন, যদিও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে কেন্দ্রের মূল্যায়নের ওপর।
দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় যারা
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন খন্দকার এনাম (দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক) ও গোলাম মাওলা শাহীন। গত কয়েক বছরে একাধিকবার কমিটি বিলুপ্ত ও পুনর্গঠনের কারণে সাংগঠনিক স্থিতিশীলতায় কিছুটা ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে এবার একটি কার্যকর, গ্রহণযোগ্য ও কর্মমুখী নেতৃত্ব গঠনে কেন্দ্র বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়ার্ড, থানা ও ইউনিট পর্যায়ে সংগঠন পুনর্গঠনের কাজও চলছে, যা নতুন মহানগর কমিটি গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নতুন কমিটি গঠনে তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আন্দোলনে ভূমিকা, তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা, কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে। পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণের নেতৃত্বে ভারসাম্য রক্ষা এবং বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সমঝোতাও বিবেচনায় রাখা হতে পারে। দলীয় হাইকমান্ড সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, খুব শিগগির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙা করতে যত দ্রুত সময়ের মধ্যে বিএনপির কাউন্সিল ও বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি প্রকাশ করা হবে। দল যোগ্যদের নেতৃত্বে আনতে কাজ করছে। এসব পদে ত্যাগীদের অগ্রাধিকার দেবে বিএনপি; দলের হাইকমান্ড এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব দলের মধ্যে কাউন্সিলের দিকে যাওয়ার ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেছেন, দৈনন্দিন কার্যক্রম চালু রাখার পাশাপাশি দল চাঙা রাখতে নানা ধরনের বৈঠক ও সাংগঠনিক রদবদলের চিন্তা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা মহানগর বিএনপি দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম সফল করতে রাজধানীর সংগঠন শক্তিশালী হওয়া জরুরি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন