রাজধানীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) বাস্তবায়নে একটি কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এই পরিকল্পনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজধানীর দীর্ঘদিনের নানা সংকট নিরসনের লক্ষ্য স্থির করেছে সংস্থাটি।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে অসহনীয় যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ু ও পানি দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আবাসন সংকটে ভুগছে রাজধানী ঢাকা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। রাজউকের আওতাধীন প্রায় ১ হাজার ৯৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং গাজীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার খাত থাকছে ৯টি। এগুলো হলোÑ আবাসন ও ভূমি ব্যবহার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পানি ও স্যানিটেশন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য, দুর্যোগ ও জলবায়ু ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ও সবুজ ভবন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং ড্রেনেজ ও বন্যা ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি খাতের জন্য পৃথক সুপারিশ, বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং সময়সীমা ঠিক করা হয়েছে। পরিকল্পনায় স্বল্পমেয়াদে ৩ বছর, মধ্যমেয়াদে ৩-৬ বছর সময় নির্ধারিত রয়েছে। এই সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জোরদারের লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া ৬-৭ বছরের দীর্ঘ মেয়াদে রাজধানীকে আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি আবাসন খাতে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, খাস ও অব্যবহৃত সরকারি জমি ব্যবহার এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেল চালুর লক্ষ্য রয়েছে সংস্থাটির। এই দিকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু, মেট্রোরেলের সঙ্গে ফিডার সার্ভিস সংযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং মেডিকেল ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের উদ্যোগও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে খাল পুনরুদ্ধার, জলাশয় রক্ষা এবং আন্তঃসংযুক্ত ব্লু নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত¦ থাকবে। অপরদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন, অগ্নি নিরাপত্তা জোরদার এবং ওয়ার্ডভিত্তিক দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠনের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সোলার প্যানেল স্থাপন এবং সবুজ ভবন নির্মাণে উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টিও অগ্রাধিকার থাকছে।
সার্বিক বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ড্যাপের সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা একটি কর্ম পরিকল্পনা সাজিয়েছি। মোট তিন ধাপে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপে নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী হাউজিংয়ের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া ঢাকার মৌলিক সমস্যাগুলো গুরুত্বের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি গৃহায়ন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে রাজউক অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর ১৫ ধারা অনুযায়ী বোর্ড গঠন করে। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীকে সভাপতি, একই মন্ত্রণালয়ে সচিবকে সহসভাপতি ও রাজউক চেয়ারম্যানকে সদস্যসচিব করে মোট ১৩ সদস্যের বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের অন্যান্য সদস্য হলেনÑ স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ ও বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) সভাপতি ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত রাজধানীর বাইরে থেকে নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য ও সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধিও থাকবেন সদস্য হিসেবে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন ইস্যুর মধ্যে ড্যাপ কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় রাজউকের পক্ষ থেকে একটি কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। বোর্ড সভায় বলা হয়, এসব কর্মপরিকল্পনা সব রাজউক বাস্তবায়ন করবে না। তবে যে কাজগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে সে সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে রাজউক।
রাজউক সূত্র জানিয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ নির্মাণ করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাঁটার রাস্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত হয়েছে, রাজউক কোনো প্লটভিত্তিক প্রকল্প নেবে না। এখন থেকে রাজউক ফ্ল্যাটভিত্তিক প্রকল্প নেবে। গত ১৯ জানুয়ারি ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ-২০২৬’ শীর্ষক অধ্যাদেশটি পাস করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এতে রাজউকের আওতাভুক্ত এলাকা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরী, ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ ও সাভার উপজেলার আওতাধীন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার আওতাধীন এলাকা, পাশাপাশি সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত এলাকায় এ আইন প্রযোজ্য হবে। এর আগে দ্য টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্য নিয়ে রাজউক গঠন হওয়ার বিধান ছিল। বর্তমানে এটি ১৩ জনে উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজউকের সব বোর্ড মেম্বাররা ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব বা বিভিন্ন দপ্তরপ্রধানরা।
তবে নতুন অধ্যাদেশে আমলাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করে বোর্ড গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে রাজউক আরও স্বচ্ছ ও সচল প্রতিষ্ঠানে রূপলাভ করবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, রাজউক বোর্ডের প্রধান কাজ হবে পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও সাম্যভিত্তিক নগরায়ণ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে রাজউক প্রস্তাবিত বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ যাবতীয় কার্যক্রম তদারক ও মূল্যায়ন করবে। নতুন অধ্যাদেশে ড্যাপ প্রণয়ন নিয়ে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ নিজের আওতাভুক্ত এলাকায় অনুমোদিত কৌশলগত পরিকল্পনা ও এলাকাভিত্তিক বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। কৌশলগত পরিকল্পনায় চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সেগুলো হলো ভবিষ্যৎ নগরীর বিস্তার এবং জনসংখ্যার প্রক্ষেপণ, প্রাকৃতিক ভূচিত্র অনুযায়ী ভূমির বিদ্যমান শ্রেণী বিন্যাস, নগরের ভূমি ব্যবহারের প্রকার ও চাহিদা নির্ণয় এবং টেকসই বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, মৌজাভিত্তিক ভূমির বিস্তারিত বিবরণ, ভূমি ব্যবহার, পুনরুন্নয়ন, পুনর্বিন্যাস এলাকাসংক্রান্ত বিবরণ, জনঘনত্ব অঞ্চল বিভাজন ও জোনিং, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়িতব্য কর্মসূচি, ইমারতের উচ্চতাসংক্রান্ত বিধিবিধান, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি।

