× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

ভার্চুয়াল মাধ্যমে ‘লাল কয়েনে’র ভয়ংকর ফাঁদ

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

লাল কয়েন আর ম্যাজিক কয়েনের (এন্টিক কয়েন) নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গুপ্তধনের লোভনীয় স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালেই ওঁৎ পেতে আছে এক ভয়ংকর প্রতারক চক্র। ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই চক্রের সাজানো মোহিনী ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন মানুষ। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার লোভই তাদের ঠেলে দিছে এক অদৃশ্য অন্ধকারে।

অবসরে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ চোখ থমকে যায় এমন এক পোস্টে- লাল কয়েন কিনব, দাম লাখ টাকা কিংবা দুই লাখ টাকা। পোস্টের মন্তব্যের ঘরে উপচে পড়া ভিড়। কেউ নম্বর দিচ্ছেন, কেউবা ব্যাকুল হয়ে খুঁজছেন সেই কাক্সিক্ষত ‘বায়ার’। যেন এক অদৃশ্য উম্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়- ধুলো-মলিন একটি পুরোনো মুদ্রা কি সত্যিই লাখ টাকার সম্পদ? নাকি এটি শুধুই এক বিষাক্ত মরীচিকা?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই লাল কয়েন আসলে কোনো গুপ্তধন নয়। এটি সুপরিকল্পিত এক প্রতারণার ফাঁদ। ভার্চুয়াল প্লাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছে সর্বনাশার জাল। এই প্রতারকদের কৌশলও চতুর। এরা এআই ব্যবহার করে বিভিন্ন তারকাদের ডিপফেক ভিডিও তৈরি করছে। এসব ভিডিও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে পোস্ট করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

কোনো কোনো ভিডিওতে দেখানো হয়, কয়েনের কাছে ধান রাখলে তা চুম্বকের মতো নড়ছে। যাকে তারা বলছে ‘রাইস পুলিং’। আসলে এই অলৌকিকতা তৈরি করা হয় কয়েনের নিচে এক ধরনের শক্তিশালী চুম্বক আর ধানের ভেতরে লোহার সূক্ষ্ম গুঁড়ো দিয়ে। আবার কখনো কখনো ভারী এই ধাতব মুদ্রা পানির ওপর ভাসতে দেখা যায়।

মূলত, কয়েন পানিতে ভাসিয়ে রাখা হয় বিশেষ ঘন লিকুইড ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষ এটিকে অলৌকিক ক্ষমতা ভেবে বিশ্বাস করে বসেন। অথচ বাস্তবে এটি নিছক কারসাজি। চুম্বক, লোহার গুঁড়ো, কিংবা বিশেষ তরলের খেলা। আগ্রহী কাউকে পেলেই সক্রিয় হয় চক্রের সদস্যরা। দলের একজনকে ‘চেকার’ বা বিদেশি কোম্পানির প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে বলা হয়- কয়েনটি ‘রেড মার্কারি’ সমৃদ্ধ। যার মূল্য কোটি টাকা। কিন্তু তা যাচাই করতে লাগবে মোটা অঙ্কের ‘টেস্টিং ফি’ বা ‘ল্যাব ফি’। এই ফির নামে ১০ হাজার থেকে শুরু করে ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়। টাকা হাতে পেলেই উধাও হয়ে যায় প্রতারকরা। এরপর বন্ধ করে দেয় ফোন। ডিলিট হয় সোশ্যাল মিডিয়ার আইডি। ভুক্তভোগীদের গল্প আরও বেদনাদায়ক।

কুড়িগ্রামের এক ব্যক্তি সাভারে মুদি ব্যবসা করতেন। তার কাছে ১০০ লাল কয়েন ছিল। ফেসবুকে পোস্ট দেখে যোগাযোগ করলে প্রতারক চক্রের সদস্যরা এই কয়েন আন্তর্জাতিক বাজারে ২ কোটি টাকায় বিক্রির লোভ দেখিয়ে তার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এখন তিনি দেনার দায়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এ ছাড়া নওগাঁর দুই ব্যক্তি একই কায়দায় সম্প্রতি প্রতারিত হন। প্লাটিনাম কয়েন বিক্রির প্রলোভনে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা। গত ১৬ এপ্রিল তারা নওগাঁ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। এরপর চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করে। 

রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে- ব্যাটার কয়েন কালেকশন বিডি, কয়েন বাজার, পুরানা কয়েন বেচাকেনা, লাল কয়েন ক্রয় বিক্রয়, লাল কয়েন বিক্রি করা হয়, লাল কয়েন ক্রয় করা হয়, ডব্লিউএলসি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন বাহারি নামে অন্তত ১০টি পেজ ও গ্রুপ পাওয়া গেছে। এসব প্লাটফর্মে রীতিমতো কয়েন ক্রয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বিভিন্ন টিভির লোগো ব্যবহার করে সংবাদ পাঠিকার কণ্ঠে এআই দিয়ে বলানো হচ্ছে- ১ টাকার কয়েন বিক্রি হচ্ছে দুই লাখে! এমনকি জনপ্রিয় তারকা ও অভিনেতাদের ‘ডিপফেক’ ভিডিও বানিয়ে ছড়ানো হচ্ছে এই ভুয়া তথ্য। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতেই এই প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে জালিয়াতরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ সালের ১ টাকার পিতলের কয়েনের বাস্তব মূল্য মাত্র ৪০-৫০ টাকা। এর কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। তথাকথিত ‘রেড মার্কারি’ও বাস্তবে অস্তিত্বহীন। এটি কেবল গুজব। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৭১৭, ১৭৯৯ বা ১৮১৮ সালের মুদ্রার আদলে মুদ্রা তৈরি করে প্রতারকরা এসব মুদ্রাকে ম্যাজিক কয়েন বলে প্রচার করে। তারা দাবি করে, এসব মুদ্রায় ‘রেড মার্কারি’ আছে। যা নাসা বা পারমাণবিক গবেষণায় লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম তালুকদারের মতে, তথাকথিত ‘রেড মার্কারি’র কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এসব মুদ্রা মূলত স্বর্ণকারের দোকান থেকে তামা-দস্তা দিয়ে তৈরি করে আনা হয়। জালিয়াতি কেবল কয়েনে সীমাবদ্ধ নেই। ব্রিটিশ আমলের ‘ম্যাগনেটিক পিলার’ নিয়েও চলছে একই ভেলকিবাজি। দাবি করা হয়, পিলারের ভেতরের উপাদান সচল যানবাহন থামিয়ে দিতে পারে! উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী ও সাবেক কর্মকর্তাদের টার্গেট করেও এই চক্র ফাঁদ পাতে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতারণার ঘটনায় ৯৫ শতাংশ প্রতারণা মামলায় সাজা হয় না। দ-বিধির ৪২০ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ৭ বছর হওয়ায় আসামিরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান জানান, এই চক্রের সদস্যরা একেকজন ঝানু অভিনেতা। এদের ধরা হলেও আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত বিশে^র কিছু দেশে এন্টিক সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাংলাদেশে এর কোনো বৈধ এজেন্ট নেই। মূলত ‘রাতারাতি কোটিপতি’ হওয়ার নেশা থেকেই মানুষ এই মরণফাঁদে পা দেয়। ইতিহাসের ধুলোবালি থেকে উঠে আসা একটি পিতলের টুকরো কখনো আপনার ভাগ্য বদলে দেবে না।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার অন্ধ বিশ্বাসই হতে পারে সর্বনাশের শুরু। ইউটিউব বা টিকটকের ভিডিও দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে সচেতন হওয়াই এই ভয়ংকর ফাঁদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। তিনি বলেন, ১ টাকার কয়েন কখনো লাখ টাকা হতে পারে না। তিনি বলেন, ভার্চুয়াল মাধ্যমে এমন প্রতারণামূলক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সোচ্চার হতে হবে। এ ছাড়া এসব প্রতারকের খপ্পর থেকে রেহাই পেতে সচেতনতার বিকল্প নেই। 

আইনশৃঙখলা বাহিনী বলছে, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা। কিন্তু বাস্তবতা হলো- বেশির ভাগ ভুক্তভোগী লজ্জা বা ভয় থেকে মামলা করেন না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত আছে। তবে এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে হবে। কারো লোভের টোপে পড়া যাবে না।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!