রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে নীরবে বিস্তার ঘটছে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের। বিদেশফেরত যাত্রী, তাদের স্বজন, এমনকি বিদায় জানাতে আসা মানুষও এখন এসব চক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। কখনো প্রবাসী সেজে, কখনো সহযাত্রী পরিচয়ে, আবার কখনো অসহায় মানুষের অভিনয় করে সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে প্রতারকরা। এরপর খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে মুহূর্তেই অচেতন করে লুটে নেয় সর্বস্ব।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, আমির হোসেন, তাজুল ইসলাম, জাকির, বারেক, মামুন, মিল্টন ও পারভেজকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অন্তত সাতটি সক্রিয় গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপে রয়েছে ৮ থেকে ১০ জন সদস্য। তারা আবার ভাগ হয়ে কাজ করে তিনটি ধাপে। স্পটার, ফলো টিম ও অ্যাকশন টিম।
বিশেষ করে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী দেশে ফিরতে শুরু করায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এসব চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এই অপরাধচক্র সক্রিয় থাকলেও উৎসব মৌসুমে তাদের তৎপরতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এইসব চক্র তিন ধাপে অপারেশন চালায়। প্রথম ধাপের সদস্যরা স্পটার হিসেবে কাজ করে। তারা বিমানবন্দরের আগমন টার্মিনাল, রেলস্টেশন, বাস কাউন্টার, আন্ডারপাস ও ফুটওভারব্রিজ এলাকায় অবস্থান নেয়। কার হাতে দামি মোবাইল, কার কাছে একাধিক লাগেজ, কে একা, কে গ্রামের বাড়ি যাবে কিংবা কার জন্য কোনো স্বজন অপেক্ষা করছে না, এসব তথ্য সংগ্রহ করাই তাদের মূল কাজ। দ্বিতীয় ধাপের সদস্যরা ফলো টিম। তারা টার্গেট যাত্রীর পিছু নেয় এবং কৌশলে শখ্য গড়ে তোলে। নিজেদের সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, দুবাই কিংবা মালয়েশিয়াফেরত প্রবাসী পরিচয় দেয়। অনেক সময় একই জেলার লোক পরিচয় দিয়ে দ্রুত সম্পর্ক তৈরি করে। আর তৃতীয় ধাপের সদস্যরা হলো অ্যাকশন টিম। তারাই চা, কফি, জুস, বিস্কুট কিংবা কোমল পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে টার্গেট ব্যক্তিকে অচেতন করে। এরপর টাকা, ডলার, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন, এমনকি ব্যাংক কার্ড পর্যন্ত নিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক সময় অচেতন যাত্রীকে দূরের কোনো এলাকায় ফেলে রাখা হয়, যাতে তিনি বুঝতেই না পারেন কোথায় কীভাবে সর্বস্ব হারিয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, চক্রের সদস্যদের বেশভূষা দেখে বোঝার উপায় থাকে না তারা অপরাধী। হাতে পাসপোর্ট, ট্রলি ব্যাগ, বিদেশি মুদ্রা কিংবা ডিউটি-ফ্রি শপিং ব্যাগ নিয়ে ঘোরাফেরা করে তারা। এতে সহজেই অন্য প্রবাসীদের বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, তারা বাস কাউন্টারে গিয়ে আগে থেকেই টিকিট কেটে রাখে। পরে টার্গেট যাত্রীকে বলে, ভাই, আমার কাছে একটা অতিরিক্ত টিকিট আছে, একসঙ্গে যাই। বাসে ওঠার পর শুরু হয় আপ্যায়ন। বিস্কুট, জুস বা চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় চেতনানাশক। কিছুক্ষণের মধ্যেই অচেতন হয়ে পড়েন ভুক্তভোগী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু বিমানবন্দরের টার্মিনাল নয়, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, বাস কাউন্টার, আশপাশের আবাসিক হোটেল ও আন্ডারপাস পর্যন্ত বিস্তৃত এই চক্রের নেটওয়ার্ক। কিছু সদস্য পরিবহন ব্যবসা, ফাস্টফুড দোকান কিংবা জুয়েলারি ব্যবসার আড়ালেও কাজ করে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের কুয়েতফেরত আমজাদ শেখ সম্প্রতি এই চক্রের খপ্পরে পড়ে নগদ ৫০ হাজার টাকাসহ প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল হারিয়েছেন। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে বাড়ি যাওয়ার বাস খুঁজছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি নিজেকে সৌদিফেরত পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে শখ্য গড়ে তোলে। পরে সায়েদাবাদ থেকে একসঙ্গে বাসে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। লোকাল বাসে করে তারা বিমানবন্দর স্টপেজ থেকে সায়েদাবাদের উদ্দেশে রওনা দেন। আমজাদ শেখ বলেন, বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পর একজন হকার আসে। ওই লোক দুইটা জুস কিনে একটা নিজে খেল, আরেকটা আমাকে দিল। জুস খাওয়ার পর মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। এরপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফেরে ঢাকা মেডিকেলে। ততক্ষণে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও মালামাল সব উধাও। একই ধরনের ঘটনার শিকার হন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার জালাল উদ্দিন। সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর এলাকায় এক ব্যক্তি নিজেকে শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে পরিচিত হয়। পরে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে নিয়ে চা পান করায়। জালাল উদ্দিন বলেন, চা খাওয়ার কয়েক মিনিট পর থেকেই মাথা ঘুরতে থাকে। এরপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফেরে উত্তরার একটি ক্লিনিকে। তখন দেখি দুই লাখ টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণালংকার কিছুই নেই।
একটি গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সবচেয়ে পুরোনো ও সক্রিয় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে আমির হোসেন গ্রুপ। এক সময় বিমানবন্দর এলাকায় একটি ফাস্টফুড দোকানে চাকরি করত আমির। পরে সেই চাকরির আড়ালেই গড়ে তোলে অপরাধচক্র।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, গত দুই দশকে অন্তত পাঁচ শতাধিক বিদেশফেরত যাত্রী এই চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন। আমিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় রয়েছে ১৬টির বেশি মামলা। কয়েকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সে।
সূত্র আরও জানায়, লিটন, পারভেজ ও জাকির এক সময় আমিরের সহযোগী ছিল। ২০২২ সালে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে ২০২৩ সালে তারা আলাদা তিনটি গ্রুপ গঠন করে তারা। এখন পৃথকভাবে বিমানবন্দর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে এসব চক্র।
সম্প্রতি এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাজুল ইসলাম নামে এক চক্রের মূলহোতাকে আটক করে। আরাফাত হোসেন নামে এক যুবক তার খালাতো ভাইকে বিদেশ পাঠাতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। বিদায় শেষে ডিপার্চার এলাকায় অবস্থানের সময় তাজুল শখ্য গড়ে তাকে কফি পান করায়। কিছুক্ষণ পরই অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। পরে অভিযান চালিয়ে এপিবিএন তাজুলকে আটক করে। তার কাছ থেকে ভুক্তভোগীর দুটি মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়। ১৫ পিস চেতনানাশক ট্যাবলেটও উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাজুল স্বীকার করে, তারা বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে শখ্য গড়ে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে অজ্ঞান করত। নিজেদের সন্দেহমুক্ত রাখতে অনেক সময় অসুস্থ কিংবা শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের অভিনয়ও করত তারা। তার দেওয়া তথ্যে মিরপুরের দারুসসালাম এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ৫৫টি মোবাইল ফোন, ১০টি এয়ারবাড, ১৫টি হাতঘড়ি, বিদেশি মুদ্রা ও চেতনানাশক ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক শুধু অজ্ঞান পার্টিই নয়, সক্রিয় রয়েছে মাদক পাচার, মানব পাচার, স্বর্ণ চোরাচালান এবং ইলেকট্রনিক পণ্য পাচারচক্রও।
সম্প্রতি যাত্রীর পেটে ইয়াবা বহন, লাগেজে মাদক পাচার, মানব পাচারচক্রের সদস্য গ্রেপ্তার এবং অবৈধ স্বর্ণ উদ্ধারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব চক্রের মধ্যে অনেক সময় আন্তঃসম্পর্কও থাকে। এক চক্র অন্য চক্রকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।
এয়ারপোর্ট এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস) অনিতা রানী সূত্রধর বলেন, বিমানবন্দর এলাকায় অজ্ঞান পার্টি, চোরাচালান ও অন্যান্য অপরাধ দমনে এপিবিএন সক্রিয় রয়েছে। অপরাধীরা নানা কৌশল ব্যবহার করলেও তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টিসহ সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। বিদেশফেরত যাত্রীদের অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর বিশ^স্ত পরিবহন ব্যবহার এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানান।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন