জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সম্প্রতি দলটির পক্ষে ঝটিকা মিছিল, গুজব, মিথ্যাচার ও অপপ্রচারসহ নানা কার্যক্রম সামনে আসছে। তাদের এসব কার্যক্রম ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নিষিদ্ধ দলটির মধ্যে পুরোনো দম্ভভরা মিথ্যাচার ফিরে আসছে। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির নেতারা দাবি করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রক্ষণশীল সংস্কৃতির উৎসাহ ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে হামলা দলটির ফিরে আসা নিশ্চিত করছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ভিশন-২০৩১ নিয়ে কাজ করছে দলটি। যদিও তৃণমূলের নেতারা বলছেন, দলীয় কার্যক্রম শুরু করতে শীর্ষ নেতাদের দেশে ফেরার কোনো বিকল্প নেই। যদিও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ফিরে আসার প্রশ্নে অনড় অবস্থানে সরকার ও বিরোধী দল। ফলে গণমানুষের বিশাল সমর্থন ছাড়া রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয় হওয়া দুরূহ।
সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নানাবিধ গুজব, মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কর্মী-সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়া এবং নানা নামে-বেনামের পোর্টালের মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো হয়রানি হিসেবে প্রমাণ করা। ফলে দলের শীর্ষ নেতারা সহজে দেশে প্রবেশের পরিবেশ গড়ে ওঠে।
এদিকে বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ও পর্যবেক্ষক দল আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত ডজনের বেশি গুজব সৃষ্টিকারী ওয়েবসাইটের বিষয়ে সতর্ক করেছে। তবে তার সঙ্গে সরকারের প্রপাগান্ডা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শক্ত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। যদিও আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি সরকার তার শক্ত অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট করেছে। এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নামে মিছিল, মিটিং বা কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, গণহত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, যে দলের প্রধানরা দেশের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে ফেলে পালিয়ে যায়, তাদের এ দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ। এ দেশে আর কখনো আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।
মুখ্য সংগঠক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, রিফাইন্ড হোক, কিংবা অন্য যেকোনোভাবেই হোক না কেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো রাজনীতি করার অধিকার নেই।
আওয়ামী লীগ এ দেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে না বলে করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ দেশে ফিরে রাজনীতি করুক দেশবাসীর মতো জামায়াতে ইসলামীও তা চায় না। যারা দেশ থেকে পালিয়ে যায়, তাদের দেশের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা বা ভালোবাসা নেই।
দেশে আওয়ামী লীগ ফিরে এসেছে, এমনটাই জানিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক ব্যর্থতা ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। তিনি এ পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কিছু কাঠামোগত ও রাজনৈতিক কারণকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে। তার মতে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ’২৪-কে ’৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি। তিনি বলেন, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিক্যাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হলো এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হয়। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামায়াত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। তিনি আরও বলেন, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে ‘মজলুমগণ’ চুপ ছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনি বাটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো এবং বিএনপি-জামায়াতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো।
যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র ও শীর্ষ নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে দলটি। যার মধ্যে অন্যতম ভিশন-২০৩১। এই ৩১ রূপরেখা সামনে রেখে সাংগঠনিক কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং তৃণমূল পর্যায়ের সমর্থন পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও দলীয় কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে নেই। তার মতে, দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে দলকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মহলে যোগাযোগ বৃদ্ধি, দলীয় নেতাকর্মীদের পুনর্গঠন, অনলাইনভিত্তিক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখার কথাও ভাবছেন বলে জানান। আরও এক নেতা বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে আওয়ামী লীগ অবশ্যই রাজনীতিতে ফিরবে। তবে সেই প্রত্যাবর্তনের উপযোগী রাজনৈতিক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। নানাভাবে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের পুনরায় সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, দলকে পুনর্গঠনে দ্রুত সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করা জরুরি। তাদের ভাষ্য, শীর্ষ নেতাদের দেশে ফিরে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে হবে। তা না হলে বর্তমান পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে না। তাদের দাবি, দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনো অনিশ্চয়তা ও আগের মতোই ভয়, অনিশ্চয়তার সঙ্গে স্থবিরতা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, আওয়ামী লীগ ফেরেনি, তারা ছিল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি। তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উপস্থিতি কখনো পুরোপুরি বিলীন হয়নি; বরং দলটি নীরব ও ছায়াভিত্তিক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। দেশের বর্তমান সরকার দল এবং বিরোধী দলের সম্পর্কের দূরত্ব যত বাড়বে তারা ততটাই সুযোগ পাবে। একই সাথে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরুত্থান হচ্ছে, বিশেষ করে দম্ভ, অস্বীকারের রাজনীতি এবং জনমতকে বিভ্রান্ত করার প্রবণতা। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে দলটির ভেতরে যে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক আচরণ তৈরি হয়েছিল, তা এখনো তাদের আচরণে স্পষ্ট। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় জনগণের মধ্যে এখনো তাদের প্রতি অবিশ্বাস ও ক্ষোভ রয়ে গেছে, যা আওয়ামী লীগের জন্য জনসম্পৃক্ত রাজনীতিতে ফেরাকে কঠিন করবে। তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন। বিরোধী দল দমন, নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক, গুম-গ্রেপ্তার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগÑ এসব ইস্যু এখনো জনপরিসরে প্রবলভাবে আলোচিত। ফলে শুধু সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়া নয়, বরং অতীত কর্মকা- নিয়ে আত্মসমালোচনা ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা ছাড়া দলটির জন্য নতুন প্রজন্ম কিংবা নিরপেক্ষ ভোটারদের আস্থা অর্জন সহজ হবে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের কারণে পূর্বের একক বয়ান নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বাস্তবতাও এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা, মামলা-আতঙ্ক ও সাংগঠনিক দুর্বলতা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন