রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভাজনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ পৃথক করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশটি নতুন করে পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। তবে এনবিআর বিভক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন মোড়।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে জারি হওয়া অধ্যাদেশটি বিল আকারে উপস্থাপিত হতে পারে। তবে অপর একটি পক্ষ জানিয়েছে, নতুন সরকার অধ্যাদেশটি এখনই সংসদে বিল আকারে তুলছে না। সংসদীয় কমিটি অধ্যাদেশটি বিল আকারে না তুলে আরও যাচাই-বাছাই করার সুপারিশ করেছে। এদিকে সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করতে হয়। ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে পাস না হলে কার্যকারিতা হারাবে এই সংস্কার উদ্যোগ।
অন্যদিকে বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে বিল উত্থাপিত না হলেও, সরকার চাইলে যেকোনো সময় এটি আবার কার্যকর করতে পারে।
আগামী ৭ জুন শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। ওই দিন বিকেল ৩টা থেকে এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। অধিবেশনে ১১ জুন বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন বলে জানা গেছে।
এনবিআর বিভক্ত করতে ইতিপূর্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার প্রতিষ্ঠান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে ঈদের আগে প্রথম বৈঠক হয়েছে।
রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে ২০২৫ সালের মে মাসে জারি হয় রাজস্বনীতি ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ। এর মাধ্যমে এনবিআর ভেঙে নীতি ও ব্যবস্থাপনা নামে আলাদা দুটি বিভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অধ্যাদেশ সম্পর্কে আয়কর বিশ্লেষক আশরাফ হোসেন খান বলেন, ‘অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আইনটি একেবারে চলে গেল। সরকার চাইলে দেশের কল্যাণে, জনগণের কল্যাণে যেকোনো আইন করতে পারে। পরবর্তীতে সরকার এটি বিল আকারে এনে, সংসদে আলোচনা করে আইনে পরিণত করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সব ধরনের সংস্কার করা উচিত। নীতি বিভাগ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করে যদি রেভিনিউয়ের জন্য ভালো হয় তাহলে সেটাই করা উচিত।’
এ সম্পর্কে ফরেন ইনভেস্টর চেম্বারের সহ-সভাপতি মো. ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি রিসার্চভিত্তিক পলিসি মেকিং করা। যাতে কান্ট্রির যে ফিসক্যাল পলিসি, সেটি যেন ইকোনমিক পলিসির সঙ্গে যায়। দুটি বিভাগ সেপারেট হয়ে বা না হয়ে, যেভাবেই হোক এই উদ্দেশ্য অর্জন হলেই আমাদের চলবে।’
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে ‘রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে একটি বিভাগ রাজস্বনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব পাবে এবং অন্যটি রাজস্ব প্রশাসন ও আদায় কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
তবে অধ্যাদেশের কিছু কাঠামোগত বিষয় নিয়ে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের একাংশের কর্মীরা। প্রায় দুই মাস এই আন্দোলন চলে। পরবর্তীতে সংক্ষুব্ধ কর্মীদের মধ্যে ২১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি এবং চাকরি থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়। যদিও তাদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা আদালতের নির্দেশে কয়েক গ্রেড অবনমন করে ফের কর্মস্থলে যোগদান করেন।
এরপরও অন্তর্বর্তী সরকার ‘রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি রাজস্বনীতি ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বিল আকারে না এনে আরও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৬ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত হলোÑ প্রতিবছর জিডিপির অন্তত দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। কিন্তু এখনো সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এ কারণে রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে এনবিআর বিলুপ্ত করে ‘রাজস্বনীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে এ সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির পাশাপাশি ব্যাংক খাতসহ অন্যান্য সংস্কারে অগ্রগতি না থাকায় আইএমএফ দুই কিস্তিতে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেনি। একই সঙ্গে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আরও ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশে গঠনের পর থেকেই এনবিআর একই সঙ্গে করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুযায়ী এই দুটি দায়িত্ব এক প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা কার্যকর নয়, কারণ এতে স্বার্থের সংঘাত, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়। কার্যপত্রে আরও বলা হয়, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একই কাঠামোর অধীনে থাকায় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ এবং জনগণের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবকে এনবিআর চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করতে হওয়ায় তিনি রাজস্ব আদায়ের তুলনায় নীতি প্রণয়নেই বেশি সময় দিচ্ছেন, ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজস্ব প্রশাসন ও রাজস্বনীতি প্রণয়ন কার্যক্রম পৃথক করতে একটি আদেশ জারি করলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। পরে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর এনবিআরের দুই সাবেক চেয়ারম্যান ও তিন সাবেক সদস্যকে নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, বিভিন্ন দলিল ও অংশীজনের মতামত পর্যালোচনা করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব প্রশাসন পৃথক করার সুপারিশ করে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে একই কর্মকর্তার দ্বৈত দায়িত্ব আলাদা করার সুপারিশ করা হয়। কমিশন আয়কর, শুল্ক ও আবগারি এবং ভ্যাটের জন্য পৃথক অধিদপ্তর গঠনেরও পরামর্শ দেয়। এসব সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং নীতি বাস্তবায়নপূর্বক রাজস্ব আহরণ পৃথক করার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন