চরফ্যাশনে সম্প্রতি একের পর এক গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসাব্যবস্থার সংস্কার এবং নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন স্থানীয় নাগরিকরা। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সেবার মান, তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
এর আগে ১৭ দফা দাবিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে ছাত্র-জনতা। তাদের অভিযোগ, গত দুই সপ্তাহে চরফ্যাশনের ইকরা হাসপাতালে এক গর্ভবতী নারী এবং মমতা ও সৌদিয়া ক্লিনিকে দুই নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গত ১১ মে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সিদ্দিক মাতাব্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে একটি লিগ্যাল নোটিশ দেন। নোটিশে সাত কর্মদিবসের মধ্যে উপজেলার অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় হাইকোর্টে রিট দায়েরের কথাও উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত সময় পার হলেও উপজেলার ৩৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ১২টি ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যাপক কোনো অভিযান বা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
ছাত্র-জনতার ঘোষিত ১৭ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা, সরকারি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা, হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন বন্ধ করা, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালু রাখা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বদলির ব্যবস্থা করা।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, এসব দাবির অধিকাংশই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের দাবি, উপজেলায় অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক মেডিকেল অফিসার, প্রশিক্ষিত নার্স, মিডওয়াইফ কিংবা ল্যাব টেকনোলজিস্ট ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ফজলুর রহমান বলেন, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক শফিউল্লাহ বলেন, সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের ওপর নির্ভরতা কমবে। তিনি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানান।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন কুমার বসাক বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এমাদুল হোসেন বলেন, ইকরা হাসপাতালে গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সৌদিয়া হাসপাতালের সার্জিক্যাল অপারেশন কার্যক্রমও বন্ধ করা হয়েছে।
একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় চরফ্যাশনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু তদন্ত বা আশ্বাস নয়, নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কার্যকর সংস্কার ও কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন