মানুষের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াটি সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। কেউ কেউ দীর্ঘ বয়স পর্যন্ত একদম সুস্থ-সবল থাকেন, আবার অনেকে অল্প বয়সেই নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত হন। বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় বা ‘হেলথস্প্যান’ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। সম্প্রতি ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান জেনেটিক্সের বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, কিছু নির্দিষ্ট পরিবারের জিনগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিন রোগমুক্ত ও সুস্থ থাকার এক বিরল চাবিকাঠি। একক কোনো ব্যক্তির চেয়ে পুরো দীর্ঘজীবী পরিবারের ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা বার্ধক্য ঠেকানোর এই বিশেষ জৈবিক রহস্য উন্মোচন করতে পেরেছেন বলে জানান।
নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের গবেষকরা দীর্ঘজীবী বাবা-মায়ের সন্তানদের ওপর পর্যবেক্ষণ চালান। এতে তারা দেখেন, যেসব ব্যক্তির বাবা-মা দীর্ঘজীবী ছিলেন, তারা তাদের সমবয়সি অন্য সঙ্গীদের তুলনায় গড়ে প্রায় ১৩ বছর বিলম্বে হৃদরোগ বা বিপাকীয় জটিলতায় আক্রান্ত হন। এর থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পাওয়ার এই ক্ষমতাটি পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে জিনগতভাবে স্থানান্তরিত হয়। গবেষক দল লাইডেন লংজিভিটি স্টাডিতে অংশ নেওয়া ২১২টি দীর্ঘজীবী পরিবারের জিনোম বিশ্লেষণ করে প্রায় ২০ হাজার জিনের মধ্য থেকে এমন ১২টি বিরল জিনগত বৈচিত্র্য খুঁজে পেয়েছেন, যা সুস্থ ও দীর্ঘায়ু পেতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণায় সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক ফল মিলেছে সিজিএএস নামে একটি বিশেষ জিনের ক্ষেত্রে, যা মূলত শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। শরীরে কোনো কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ভাইরাসের আক্রমণ ঘটলে এই জিনটি প্রদাহের সৃষ্টি করে। দীর্ঘজীবী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের শরীরে এই জিনের একটি মাত্র সক্রিয় অনুলিপি বা কপি রয়েছে। ফলে তাদের শরীরে ক্ষতিকর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কম তৈরি হয়, যা বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। একই সঙ্গে রোগজীবাণু ধ্বংস বা ক্ষত নিরাময়ের মতো স্বাভাবিক কাজগুলোও ব্যাহত হয় না। বিজ্ঞানীদের মতে, সিজিএএস জিনের এই মৃদু ও নিয়ন্ত্রিত কার্যকারিতাই দীর্ঘকাল সুস্থ থাকার অন্যতম কারণ।
অবশ্য গবেষকরা এখনই এই আবিষ্কার মানুষের চিকিৎসায় প্রয়োগ করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। কারণ সিজিএএস জিনকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিলে মানুষের শরীরে ক্যানসার ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যেতে পারে। গবেষণার পরবর্তী ধাপ হিসেবে বিজ্ঞানীরা জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটে এই জিনগত রূপান্তরটি ‘কিল্লিফিশ’ নামে এক বিশেষ প্রজাতির মাছের শরীরে প্রয়োগ করে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছেন। মাত্র তিন থেকে নয় মাস আয়ুর এই মেরুদ-ী প্রাণীটির ওপর পরীক্ষার মাধ্যমে জিনের সুনির্দিষ্ট প্রভাব খুব দ্রুত জানা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার কেবল দীর্ঘজীবী পরিবারগুলোর রহস্যই উন্মোচন করেনি, বরং ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন