ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে সচিবালয় অলসে!

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৬:০১ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক কাজ চলছে শম্বুকগতিতে। সচিবসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সময়মতো অফিসে আসছেন না। গত কয়েক দিনে সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ সচিব ও কর্মকর্তা দপ্তরে উপস্থিত থাকছেন না।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ নিজ কার্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে অবস্থান করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর শেষ করে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই অনুপস্থিত সময়ে অনেক মন্ত্রী, সচিব ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস সময় অনুযায়ী উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে দুজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা তার সঙ্গী হয়েছেন। কিন্তু যারা দেশে আছেন তারা এবং সচিবালয়ের কর্মীরা নিয়মমত আসছেন কি নাÑ এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের সচিব নির্ধারিত সময়ের পর উপস্থিত হন দপ্তরে। দেশে থাকা অনেক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরাও সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে আসছেন। অথচ মন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, উপসচিবসহ অন্যন্যি পদবির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে গা-ছাড়া ভাব দেখা  যাচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দেখা গেছে, যেসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে আছেন, তাদের দপ্তরে অফিস শুরুর দেড় ঘণ্টা পরে গিয়েও কর্মকর্তাদের দেখা মেলেনি; যারা দেশে রয়েছেন, তাদের দপ্তরে সোয়া ৯টার দিকে ঝাড়পোছ করার প্রস্তুতি দেখা গেছে। সচিবালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে যাওয়ার গেট বন্ধ থাকতে দেখা যায় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৬ মিনিটেও। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েও একই চিত্র দেখা গেছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করা শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীকে সকাল ৯টায় সচিবালয়ে উপস্থিত হতে দেখা গেছে। এমনকি সরকারি বন্ধের দিনও প্রধানমন্ত্রীকে অফিস করতে দেখা গেছে সচিবালয়ে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে কয়েক দফা পরিদর্শন করে সময়মতো মন্ত্রী, সচিব এবং অন্যান্য পদবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে হাজির না হওয়ার বিষয়টি নজরে আসে। এর পরই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অফিসের সময়সূচি নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম থেকেই নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস শুরু করে প্রশাসনকে কর্মঠ হওয়ার বার্তা দেন। শনিবার ছুটির দিনে অফিস করেও কর্মীদের বাড়তি কাজে মনোনিবেশ করতে অনুপ্রাণিত করেন। হঠাৎ সাত মন্ত্রণালয়ে হাজির হয়ে তিনি যেমন সংবাদের শিরোনাম হন, তেমনি কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তার মনোযোগও দেখা যায়। এরই মধ্যে নাগরিক সেবা দেওয়া, প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বাড়ানো ও বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ে জোর দিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশনা দিয়েছে। সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কিংবা ব্যক্তিগত কাজের কারণে অনেক কর্মী নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকেন না। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে জনসাধারণ ও অন্যান্য দপ্তরের যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং নাগরিক সেবায় বিঘœ ঘটে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রে তুলে ধরা হয়। সে কারণে সচিবালয়ের কর্মীদের দপ্তরে উপস্থিত ও অবস্থানের সময়সূচি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ জুন মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে তার প্রথম বিদেশ সফর শুরু করেন। সেখান থেকে সরাসরি চীনে গেছেন তিনি। শুক্রবার সফর শেষ করে দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ১১ জুন ঘোষণা হওয়া আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে অধিবেশন চলছে জাতীয় সংসদে। প্রধানমন্ত্রী না থাকায় অনেক মন্ত্রী যে সংসদে যাচ্ছে না, তা সংসদের আলোচনায় এনেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। ঢাকা-১২ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেছেন, ‘আমি লক্ষ করছি, বাজেট অধিবেশনে অধিকাংশ সময় আমাদের মন্ত্রীরা থাকেন না।’

সচিবালয়ে সকালে যা দেখা গেল : বাজেট অধিবেশন চলায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশেই রয়েছেন; আর প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীন সফরে। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী ও অর্থ উপদেষ্টার দপ্তরে ৯টা থেকে ৯টা ৫ মিনিটের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিব আসিফ ইকবাল, সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ সেলিম, জনসংযোগ কর্মকর্তা সিরাজ উদ-দৌলা খান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম (সোহাগ), প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান এবং উপদেষ্টার একান্ত সচিব মো. সারওয়ার মোর্শেদকে দপ্তরে দেখা মেলেনি। ওই দপ্তরে অন্য একজন কর্মী বলেন, ‘মন্ত্রীর আসতে দেরি আছে। তিনি ১২-১টা নাগাদ আসতে পারেন।’

এদিন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বাজেটবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীর থাকার কথা ছিল; একই সঙ্গে সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা ১১টা থেকে। অর্থসচিবের দপ্তরে যেতে যেতে দেখা যায় তিনি তার কক্ষে ঢুকছেন। তখন ঘড়ির কাঁটায় ৯টা বেজে ৭ মিনিট। এরপর ৯টা ১০ মিনিট পর্যন্ত অর্থসচিবের দপ্তরে তার কক্ষ ছাড়াও অন্য ছয় কক্ষের দুটিতে কোনো কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। সারা বছরই ব্যস্ত থাকা অর্থ মন্ত্রলায়ের প্রশাসন ও সমন্বয় শাখার ১০ কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে ৯টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তিনজনকে পাওয়া যায়নি। আর প্রবিধি অনুবিভাগ ঘুরে ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত দুই কর্মকর্তার দেখা মেলেনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ৯টা ৩ মিনিটেও স্বরাষ্ট্রসচিব আসেননি। ৯টা ৪ মিনিটে তার খোঁজ নিতে একান্ত সচিবের কক্ষে ঢুকে দেখা যায়, তখন পর্যন্ত তিনিও আসেননি। পরে ৯টা ১২ মিনিটে দপ্তরে আসেন স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী; একই সময়ে তার একান্ত সচিব মো. শিমুল আকতারও ঢোকেন মন্ত্রণালয়ে। সোয়া ৯টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, এক নারীসহ দুই কর্মী মন্ত্রীর কক্ষ পরিষ্কার করছেন। পরে মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, স্বরাষ্ট্র উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফয়সল আহমেদ অফিসে এসেছেন ৯টা ১৪ মিনিটে, আর পুলিশ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নাইম ঢুকেছেন ৯টার পরপর। একই ভবনে থাকা ধর্ম মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদকে পাওয়া যায়নি। তার একান্ত সচিব মোহাম্মদ মাহবুব আলমও আসেননি সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।