বাংলাদেশের রাজস্বের ঘাটতি একটি গুরুতর সামষ্টিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘাটতি সামাজিক সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিবন্ধকতা রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করছে। এই ঘাটতি পূরণে কর ন্যায়বিচার ও টেকসই সরকারি অর্থব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘জাতীয় বাজেটে কর ন্যায্যতা : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব প্রস্তাবনার ওপর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংলাপে গতকাল এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর কারণে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ভ্যাট আয়ের মাত্র ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে এনবিআর।
সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি এবং সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সংলাপে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, এনবিআর সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকীসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।
সংলাপে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা যেসব দাবি জানিয়ে আসছিলেন, বাজেটে তার কিছু প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে কিছু নতুন কর-ব্যবস্থা শিল্প খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, একাধিক কোম্পানির মধ্যে আর্থিক লেনদেনের ওপর নতুন করে সুদ ও কর আরোপের বিধান শিল্পের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, কর ন্যায্যতা শুধু বাজেট ঘোষণার সময় আলোচনার বিষয় হতে পারে না। বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নেওয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থাকতে হবে। কর-ব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত করতে হলে ব্যবসায়ী, করদাতা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
এনবিআর সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ন্যায়সঙ্গত কর-ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারলে রাষ্ট্রের পক্ষে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় জনসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কর ন্যায্যতা ও রাজস্ব আহরণ একে অপরের পরিপূরক। জনগণের আস্থা অর্জন করে কর আদায় বাড়াতে হলে কর-ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমানোর আহ্বান জানিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা রিজওয়ান রহমান বলেন, এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে বিভাজন রয়েছে, তা দূর করতে হবে। এনবিআরের নীতি বিভাগ (পলিসি উইং) ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক বিভাগ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি বলেন, এক সঙ্গে সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। কাউকে রাজনৈতিকভাবে, কাউকে অর্থনৈতিকভাবে সন্তুষ্ট করতে হয়। বিভিন্ন দিক থেকে নানা ধরনের চাপ আসে। কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কোনো ব্যবসায়ীর দাবি নয়। যে ব্যবসায়ী কর দিতে চায় না, সে কর দেবেই না। কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে তার কোনো সমস্যা নেই। এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপ থেকেই আসে। অতীতের অভিজ্ঞতাও তাই বলে।
সংলাপে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। কিন্তু বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাব অনেক সময় একশ্রেণির জন্য সুবিধাজনক হলেও অন্যশ্রেণির জন্য বৈষম্য তৈরি করে। তাই কর ন্যায্যতার বিষয়টি শুধু কর কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক রাজস্ব-ব্যবস্থা ও সম্পদের বণ্টনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, শুধু কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর কারণে বাংলাদেশ একটি অর্থবছরে আনুমানিক ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য কর রাজস্ব হারিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক সংগৃহীত প্রকৃত মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) পরিমাণ এর প্রকৃত সম্ভাবনার মাত্র ২৮% থেকে ২৯%-এর সমান। অর্থনীতিতে কর বাবদ মোট ক্ষতির পরিমাণ স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় ব্যয়ের ২.৬ গুণের সমান বলে ধারণা করা হয়। তা ছাড়া, কর অব্যাহতির বিষয়টি যদি স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা না হয়, তবে তা করের আওতা কমিয়ে রাজস্বের ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
রাজস্বের এমন বিশাল ঘাটতি কেবল সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকেই দুর্বল করে না, বরং অপরিহার্য জনসেবা নিশ্চিত করা, বৈষম্য হ্রাস করা এবং একটি অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করার ক্ষেত্রেও সরকারের সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়।
সংলাপে বক্তারা বলেন, রাজস্ব বোর্ডকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করে রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগকে আলাদা করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে প্রতিষ্ঠানকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।

