ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

হাসপাতাল ঘিরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগী

স্বপ্না চক্রবর্তী
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৬:০৭ এএম

খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বাবাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসেছেন আবীর রহমান। পায়ের হাড়ের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) বহির্বিভাগ থেকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। আর তারপর থেকেই শুরু হয় বিপত্তি। ঢামেকের অর্থোপেডিক বিভাগের বারান্দা থেকে পেছনের গেট দিয়ে বাইরে বের হয়ে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে শুরু করলে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল একদল যুবক। সবার এককথা সবচেয়ে কম দামে অ্যাম্বুলেন্স দেবেন তারা। একজনকে কোনোমতে ২ হাজার টাকায় রাজি করালেও আরেকজন এসে তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। ঢামেক থেকে পঙ্গু হাসপাতালের দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া বেশি চাইলেও এই অ্যাম্বুলেন্সচালকদের দৌরাত্ম্য থেকে অসুস্থ বাবাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার তাগিদে ২ হাজার টাকার ভাড়াতেই একটি অ্যাম্বুলেন্সের আদলে মাইক্রোতে করে রওনা দেন আবীর ও তার ছোট ভাই সাব্বির।

একই রকমভাবে অ্যাম্বুলেন্সচালকদের দৌরাত্ম্যে মরদেহ নিয়েও বাড়ি ফিরতে দেরি হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা তমসা বিশ^াসের পরিবারের। একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করলে আরেক অ্যাম্বুলেন্সচালক এসে বাধা দিয়ে তার অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার জন্য জোড়াজুড়ি শুরু করে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে এক কর্মীর সহায়তা একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করলে সকাল-দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। মরদেহ নিয়ে রওনা দিতে দিতে তাদের বেজে যায় বিকেল ৩টা। ঠিক কয়টায় গিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে পৌঁছাতে পারবেন জানেন না পরিবারের কেউ।

শুধু ঢাকা মেডিকেল বা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল নয়, দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় অবস্থায় নিজেদের প্রভাব কাটাচ্ছে এ অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, রোগী ও স্বজনদের অসহায় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায়, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিকল্প সেবা বাধাগ্রস্ত করা এবং রোগী পরিবহনে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কোটি টাকার অনিয়ম চলছে। অনেক সময় এদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও।

জরুরি মুহূর্তে জিম্মি রোগী : হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কোনো রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর কিংবা বাড়িতে নেওয়ার প্রয়োজন হলে স্বজনদের প্রথম কাজ হয় একটি অ্যাম্বুলেন্স খোঁজা। কিন্তু অভিযোগ, অনেক সরকারি হাসপাতালের গেটেই সিন্ডিকেটের সদস্যরা রোগীর স্বজনদের ঘিরে ধরে। তারা নিজেদের নির্ধারিত গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ দিতে চায় না। ধামরাই থেকে রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে মাকে নিয়ে আসা আশীষ সরকার বলেন, আমার মা এখানে চিকিৎসা নিয়ে অনেকটাই সুস্থ। এখন বাড়ি ফেরার জন্য একটা গাড়ি ঠিক করতে নিচে নেমেছিলাম। কিন্তু হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা দালালরা বলেছে বাইরে থেকে গাড়ি আনলে ঢুকতে দেবে না। পরে বাধ্য হয়ে তাদের অ্যাম্বুলেন্স নিতে হয়েছে। ভাড়াও নিয়েছে প্রায় দ্বিগুণের বেশি। একই অভিযোগ করেন হবিগঞ্জের রিচি ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে আসা শফিকুল হকের ছেলে সাইফুল হক। তিনি বলেন, বাবাকে প্রথম যেদিন এখানে এনে ভর্তি করি, সেদিন থেকেই নিচে নেমে প্রতিদিন দেখি এসব সিন্ডিকেটের লোকজন বাইরে থেকে কোনো গাড়িকে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না। পরে বাধ্য হয়ে অসহায় রোগীরা বাড়তি ভাড়া দিয়ে তাদের অ্যাম্বুলেন্সে চড়েই বাড়ি যায়। জীবিত বা মৃত কোনো ক্ষেত্রেই এই সিন্ডিকেটের কিছু যায়-আসে না।

কীভাবে কাজ করে সিন্ডিকেট : সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের সঙ্গে কিছু অসাধু দালাল, চালক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগ থাকে। তারা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড ও গেট এলাকায় অবস্থান করে রোগী শনাক্ত করে। সিন্ডিকেটের সাধারণ কৌশলগুলো হলো, রোগীর স্বজনদের বিভ্রান্ত করা, বিকল্প অ্যাম্বুলেন্সের চালকদের হাসপাতালে প্রবেশে বাধা দেওয়া, দূরত্বের তুলনায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, রসিদ ছাড়া অর্থ গ্রহণ, কমিশনের ভিত্তিতে রোগী পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক কিলোমিটার পথের জন্যও কয়েক হাজার টাকা ভাড়া দাবি করা হয়। রাতের বেলা, ছুটির দিন কিংবা সংকটময় পরিস্থিতিতে এই ভাড়া আরও বেড়ে যায়। দর কষাকষির সুযোগও থাকে না, কারণ রোগীর অবস্থা বিবেচনায় স্বজনরা এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতি নজরদারি করার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ নেই।

তবে মাঝেমধ্যে হাসপাতালের পক্ষ থেকেই এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় জানিয়ে পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের সীমিত জনবল নিয়েই তাদের বিতাড়িত করতে অভিযান পরিচালনা করি প্রায়ই। কিন্তু তাদের একবার তাড়িয়ে দিলে কি হবে। ঠিকই কোনো না কোনোভাবে আবারও ফিরে আসে। এই হাসপাতালে না পারলে অন্য হাসপাতালে। যতদিন অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার মধ্যে না আনা হচ্ছে ততদিন এমনটা চলতেই থাকবে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : বিভিন্ন সময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ থামছে না। প্রশ্ন উঠেছে, হাসপাতালের ভেতরে ও গেট এলাকায় প্রকাশ্যে দালাল চক্র সক্রিয় থাকলেও কেন তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালভিত্তিক ডিজিটাল অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশ এবং অভিযোগ গ্রহণে কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে সজাগ অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেন হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে আর আমরা কোনো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেইনি এমন নজির নেই। তবে হ্যাঁ, এটা অবশ্যই ঠিক যে একটি অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার নীতিমালা প্রয়োজন। তা হলেই সেবাটি সবার জন্য সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।

সাধারণ মানুষের দাবি : রোগী ও স্বজনরা বলছেন, চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করাও স্বাস্থ্যসেবার অংশ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা না গেলে রোগীদের দুর্ভোগ কমবে না। স্বাস্থ্যসেবা খাতে সংস্কারের আলোচনার মধ্যেই সরকারি হাসপাতাল ঘিরে গড়ে ওঠা অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও সুশাসনের ইস্যু হয়ে উঠেছে। রোগীর জীবনরক্ষার মুহূর্তকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বাণিজ্য বা জিম্মি পরিস্থিতি চলতে পারে নাÑ এমন দাবিই এখন সাধারণ মানুষের।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেছেন, হাসপাতাল ঘিরে যেমন দালাল সিন্ডিকেট মাথাচাড়া দিতে পারবে না তেমনি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটও চলবে না। শিগগিরই আমরা এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করব। একটি রোগীরও যাতে দুর্ভোগ পোহাতে না হয় সেটিই আমাদের লক্ষ্য।