দীর্ঘ আট বছর বন্ধ থাকার পর সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলো পুনরায় চালুর সরকারি তোড়জোড় শুরু হতে না হতেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের আশ্বাসে লাখো পাথর শ্রমিকের পরিবারে যখন খুশির হাওয়া বইছে, ঠিক তখনই কোয়ারি চালুর আগেই ইজারা নেওয়ার আগাম অভিযোগ আসায় সিলেটজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযো গমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে সিলেটের পরিচিত ধনকুবের ফাহিম আল চৌধুরী বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তার দাবি অনুযায়ী, পাথর কোয়ারিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে খোলার আগেই সরকারের ভেতরে থেকে অন্তত চারজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে লিজ বা ইজারা নিশ্চিত করে দেওয়া হয়েছে। যদিও লাইভে তিনি সুনির্দিষ্ট কারো নাম প্রকাশ করেননি, তবে তার কাছে এই চারজনের নাম ও তথ্য সংরক্ষিত আছে বলে দাবি করেন। ফাহিম আল চৌধুরীর এই বক্তব্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সচেতন মহলে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইজারা নিশ্চিতের তালিকায় যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তারা সবাই ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ‘নিজের লোক’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। ফলে পাথর কোয়ারি খোলার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই দলীয় বিবেচনায় পর্দার আড়ালে ইজারা বণ্টনের এই গুঞ্জন পুরো বিষয়টিকে বড় ধরনের বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, কোয়ারিগুলো খোলার আনুষ্ঠানিক তোড়জোড় এখন শুরু হলেও, বাস্তবে বন্ধের এই দীর্ঘ সময়ে পাথর চুরি ও লুটপাট কখনোই পুরোপুরি থামেনি। বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ‘সাদাপাথর’ পর্যটন এলাকায় দিনের বেলা পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও, রাতের আঁধারে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় সেখানে চলে দেদারসে পাথর উত্তোলন। পরিবেশ ধ্বংসকারী নিষিদ্ধ যন্ত্র বা সনাতন পদ্ধতিতে কোয়ারি ও নদীগর্ভ থেকে প্রায়ই লাখ লাখ টাকার পাথর লুটপাট করে পাচার করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে নৌকা বা পাথর জব্দ করলেও মূল হোতারা অধরা থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে আইনি নিষেধাজ্ঞার দোহাই দিয়ে সাধারণ লাখ লাখ শ্রমিকের রুটি-রুজি বন্ধ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নিচ্ছে। ফলে ‘সাদাপাথর’-এর মতো নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য যেমন কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে, তেমনি সরকারও হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব।
অথচ আদালতের নির্দেশে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই পাথর রাজ্য সচল করার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন ও লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার করুণ ইতিহাস। ২০১৮ সালে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর পরিবেশ ধ্বংসকারী বোমামেশিন ও অবৈধ যন্ত্রপাতির ব্যবহার বন্ধ করতে গিয়ে সিলেটের ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি, জাফলং, লোভছড়াসহ মোট ১৭টি পাথর কোয়ারি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সিলেটের অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ পাথর ও পরিবহন শ্রমিক এবং ব্যবসায়ী চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। নির্ভরশীলদের সংখ্যা ধরলে সব মিলিয়ে অর্ধকোটির কাছাকাছি মানুষের জীবনে নেমে আসে মানবেতর সংকট। জীবিকা পুনরুদ্ধারের দাবিতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা লাগাতার আন্দোলন, অবরোধ ও মানববন্ধন করেছেন। এমনকি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুজন উপদেষ্টাকে গোয়াইনঘাটে গিয়ে সংক্ষুব্ধ শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলনের মুখেও পড়তে হয়েছিল।
মূলত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, জীবন-জীবিকার করুণ দশা ও তীব্র জনদাবির কথা বিবেচনা করে সরকার কোয়ারিগুলো পুনরায় খুলে দেওয়ার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সিলেট-৪ আসন থেকে তৎকালীন বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী তার নির্বাচনি প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পরিবেশের ক্ষতি না করে পাথর উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হবে। নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সফল হন। তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। ফলশ্রুতিতে, সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই মূলত পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে এবং নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে কোয়ারিগুলো থেকে পুনরায় পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে সরকার নীতিগত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তবে কোয়ারি চালুর সম্ভাব্য এই রূপরেখা ও আগাম ইজারার গুঞ্জন নিয়ে কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ব্যক্তিরা। সিলেটের পরিবেশবাদী আন্দোলনের শীর্ষনেতারা মনে করেন, পাথর কোয়ারি খোলার নামে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সিন্ডিকেট বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে মেনে নেওয়া হবে না। বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান যেভাবে সিলেটের পরিবেশ ও ইকো-সিস্টেম রক্ষায় শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন পরিবেশবাদীরা। সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা তার দায়িত্ব পালনকালে স্পষ্ট রূপরেখায় বলা হয়েছিল, সিলেটের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত কোনো স্থান থেকে পাথর উত্তোলন করতে দেওয়া হবে না। তিনি জাফলং, বিছানাকান্দি বা ভোলাগঞ্জের মতো পর্যটন এলাকাগুলোর নদী ও পাহাড় সুরক্ষায় কোনো ছাড় না দেওয়ার নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং বিজ্ঞানসম্মত ও আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত না করে কোয়ারি চালুর ঘোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরিবেশবাদী, বেলার নেতা কবি কাশমির রেজার দাবি, সেই উদ্যোগ ও পরিবেশ সুরক্ষার আইনি অবস্থানকে ক্ষুণœ করে যেন কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার চেষ্টা করা না হয়।
এদিকে দীর্ঘদিনের কর্মহীনতা কাটিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করা স্থানীয় সাধারণ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরাও তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গোয়াইনঘাটের পাথর শ্রমিক আনিস (৩৫), মানিক (৩২) ও খালিক (২৯) বলেন, ‘কয়টা বছর বড় কষ্টে দিন গেছে ভাইসাব। নির্বাচনের সময় মন্ত্রীসাহেব কথা দিয়েছিলেন যে তিনি নির্বাচিত হলে পাথর কোয়ারি খুলবেন, আমরাও তাকে বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছিলাম। এখন দেখা যাক আমাদের এই চরম দুর্দশার অবসান হয় কি না। আমরা মন্ত্রীর মুখে কোয়ারি খোলার আশ্বাস শুনে খুবই আশা নিয়ে পথ চেয়ে আছি।” অন্যদিকে কোম্পানীগঞ্জের পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের একাংশ দাবি জানিয়েছেন, কোয়ারি খোলার সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক, তবে তা যেন সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজে আসে, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পকেটে না যায়।
কোয়ারি নিয়ে বিতর্ক ও সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ নিজের অবস্থান ও সরকারি পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গেল বুধবার সিলেটে ৪ দিনের এক সফরে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জোরালো ভাষায় বলেছেন, পাথর কোয়ারি খুলবেই, তবে এখানে কোনো ধরনের হরিলুট বা অনিয়মের সুযোগ দেওয়া হবে না। আইন মেনে এবং পরিবেশ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখেই পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে পরিবেশ ও আইনি নানা জটিলতা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জড়িত থাকার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি আইন ও আদালতের নিয়ম মেনে গুছিয়ে আনতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে পরিবেশ অক্ষুণœ রেখে ও সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেই সরকার ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং কোনো সিন্ডিকেটের প্রভাব এখানে কাজ করবে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন