যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় একই জমি দেখিয়ে চারটি কলেজ প্রতিষ্ঠার কাগজপত্র ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সাবেক অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার অচিন্ত্য কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে দুই কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার লখাইডাঙ্গা (লখাইভাঙ্গা) গ্রামে মাত্র ৭২ শতক জমিতে চারটি কলেজের অবকাঠামো দেখানো হয়েছে। অথচ বিধি অনুযায়ী একটি কলেজের জন্যই ন্যূনতম ৬০ শতক জমি প্রয়োজন। বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই নিজস্ব নামে জমির মালিক নয়। অভিযোগ রয়েছে, অক্ষয় কুমার নামের এক ব্যক্তির দাদার রেকর্ডীয় জমি ব্যবহার করে একের পর এক প্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা চারটি প্রতিষ্ঠান হলো, মশিয়াহাটি অক্ষয় ডিপ্লোমা ইন কৃষি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, মশিয়াহাটি অক্ষয় ডিপ্লোমা ইন ফিশারিজ প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, মশিয়াহাটি অক্ষয় মহিলা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মশিয়াহাটি অক্ষয় মহিলা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড বিএম কলেজ। কাগজে-কলমে এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৪৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেকেই কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। আবার নিয়ম বহির্ভূতভাবে গোপন নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও অধ্যক্ষরা জানান, ২০০৭ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীরা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিনা বেতনে কাজ করে যাচ্ছেন। নিয়োগ ও এমপিও করানোর আশ^াস দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই লাখ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। বারবার অর্থ নেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক অধ্যক্ষ অচিন্ত্য কুমার মন্ডল নিয়োগপত্র, রেজুলেশন, জমির কাগজসহ সব গুরুত্বপূর্ণ নথি নিজের কাছে আটকে রেখেছেন। বকেয়া ঘুষ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করতেই এসব কাগজপত্র জিম্মি করে রাখা হয়েছে বলে দাবি শিক্ষক-কর্মচারীদের। ফলে বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষরা শিক্ষা বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
মশিয়াহাটি অক্ষয় ডিপ্লোমা ইন কৃষি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ বিপ্রজিত বিশ্বাস জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ২৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার শিকার। অপরদিকে ফিশারিজ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রভাত কুমার মন্ডল বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের নামে এক ইঞ্চি জমিও নেই, অথচ ২০১২ সাল থেকে ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী বিনা বেতনে কাজ করছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জমি দানের নামেও প্রতারণা করা হয়েছে। একাধিক দাতার কাছ থেকে জমি নেওয়ার কথা বলে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে একই জমি দেখিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান খুলেছেন অচিন্ত্য মন্ডল। এতে অন্তত ৪০ জন শিক্ষিত মানুষ চাকরির আশায় সর্বস্ব হারিয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক অধ্যক্ষ অচিন্ত্য কুমার মন্ডলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদ ইকবাল জানান, তিনি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং অনিয়মের বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। জমি সংকট ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করে ধাপে ধাপে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারী ও এলাকাবাসী দ্রুত সরকারি তদন্ত, আটকে রাখা কাগজপত্র উদ্ধার এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন