‘ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সিলেট’Ñ নামটি শুনলেই মনে হয়, এই বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি বিমানের ওঠানামা ঘটে অহরহ। কিন্তু কার্যত এমনটা হয় না। এই বিমানবন্দরে ওঠানামা নেই কোনো বিদেশি বিমানের। শুধু ‘লোকাল’ বা ‘অভ্যন্তরীণ’ বিমান চলাচলের মধ্যে সীমাবদ্ধ এই ‘ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে’র কার্যক্রম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশকিছু আন্তর্জাতিক বিমান কোম্পানি এ বন্দর ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল, কিন্তু পায়নি। এক্ষেত্রে স্লট বরাদ্দের সব প্রস্তুতি থাকলেও শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আপত্তির কারণে কোনো বিদেশি বিমান সংস্থাকে সে সুযোগ দেওয়া হয় না। এমনকি দেশি বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো সিলেট থেকে বহির্বিশ্বে ফ্লাইট পরিচালনা করতে চাইলেও বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ কোনো আগ্রহ দেখায় না। সেখানে একক আধিপত্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। বাইরের যে কয়টি গন্তব্যে সিলেট থেকে ফ্লাইট ছেড়ে যায়, তার সবই পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ফলে ভাড়া নিয়ে তারা সীমাহীন বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করে থাকে। যাত্রীসেবাও দেওয়া হয় যাচ্ছেতাই।
সূত্র জানায়, ওসমানী বিমানবন্দরে দুবাইভিত্তিক বিমান সংস্থা ‘ফ্লাই দুবাই’-এর কার্যক্রম চালুর এক বছরের মাথায় বন্ধ করে দিতে হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কারণে। একই সময়ে সৌদি আরবভিত্তিক বিমান কোম্পানি ‘এয়ার আরাবিয়া’কে অনুমতি এবং স্লট দিয়েও পরে তা ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
জানা গেছে, এই বন্দর থেকে কার্যক্রম চালাতে আগ্রহী বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা দুবাইভিত্তিক বিমান সংস্থা ‘এমিরেটস’। আসতে চায় ভারতের কোম্পানি ‘ইন্ডিগো’ও। এ রকম আরও কয়েকটি সংস্থা সিলেট থেকে বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় অতীতে আগ্রহ দেখালেও শুধু বিমানের আপত্তির কারণে তার কোনোটাই বাস্তবায়িত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দখল না ছাড়লেও তারা সিলেট থেকে বিশ্বের একাধিক গন্তব্যের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিতে চাইছে। এরই মধ্যে অতিরিক্ত ব্যয় ও লস দেখিয়ে সিলেট থেকে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারগামী বিমানের সবচেয়ে লাভজনক ফ্লাইট পরিচালনা করতে অনীহা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এক্ষেত্রে অন্যদেরও সে সুযোগ দিতে রাজি নয় বিমান। এ নিয়ে সিলেট ও লন্ডনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফ্লাইট বলবত রাখার দাবিতে প্রবাসীরা আন্দোলনে নেমেছেন। সেই দাবিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে বর্তমান প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র ও বিমানবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হুমায়ূন কবিরও একাত্মতা প্রকাশ করেন। এমনকি হুমায়ুন কবির লন্ডনপ্রবাসীদের নিয়ে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে গত বছরের শেষদিকে বলাকায় একটি স্মারকলিপিও দেন।
সিলেট বিমানবন্দর সূত্র জানায়, বিদেশি বিমান ওঠানামা বা ফ্লাইট পরিচালনার সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে ওসমানী আন্তর্জাাতিক বিমানবন্দরে। এ মুহূর্তে একসঙ্গে চার-পাঁচটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্লট নিতে পারার সুবিধা বা পরিধি রয়েছে এখানে। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আপাতত জেদ্দা, দুবাই, মাস্কাট, ম্যানচেস্টার ও লন্ডন ফ্লাইট চালু রেখেছে বিমান। তবে আগামী মাসে বন্ধ হচ্ছে ম্যানচেস্টার ফ্লাইট।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মানের সব ধাপ উত্তীর্ণ করেছে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নিশ্চিত করা হয়েছে বিমান ও যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি। তবুও সেখানে কোনো বিদেশি বিমান নামছে না। সিলেট থেকে কোনো বিদেশি বিমান সংস্থা ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারে না। বলা হচ্ছে, এর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বিমান’।
সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গায়ের জোরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিদেশি বিমানের ওঠানামা অনেকটা অলিখিতভাবে ‘নিষিদ্ধ’ করে দেয়।
সূত্র জানায়, সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়ে অনুমতি চেয়েছিল কয়েকটি বিদেশি বিমান সংস্থা। এগুলোর মধ্যে এমিরেটস, এয়ার আরাবিয়া, সৌদিয়া এয়ারলাইনস, ফ্লাই দুবাইসহ বেসরকারি কয়েকটি নামিদামি বিমান সংস্থাও ছিল। বিগত সরকারের সময় শুধু ফ্লাই দুবাই অনুমতি পেয়ে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করতে পেরেছিল। সংস্থাটি অফিস করেছিল সিলেটে জেল রোডের চেম্বার ভবনের পাশে। কিন্তু এক বছরের মাথায় সবকিছু গুটিয়ে সিলেট থেকে তাদের চলে যেতে হয়।
অ্যাভিয়েশন সূত্র জানায়, শুরুতে এয়ার আরাবিয়া ও ফ্লাই দুবাইকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যাত্রী হারানোর ভয়ে পরে এয়ার আরাবিয়াকে আর নামতে দেওয়া হয়নি। বছরখানেক শুধু ফ্লাই দুবাই নামতে পেরেছিল। তারা কম পয়সায় ভালোই সেবা দিচ্ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বছরখানেকের মধ্যে তার স্লটও কেড়ে নেওয়া হয়। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর থেকে বিদেশি একাধিক বিমান সংস্থা বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি আর পায়নি। সেই থেকে বিভিন্ন অজুহাতে তাদের স্লট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। সেখানে একাই রাজত্ব করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) সিলেট অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান রুশো চৌধুরী বলেন, বিমানের আপত্তির কারণে সিলেটে অন্য বিমান নামতে পারছে না। ফ্লাইট শুরু করেও ফ্লাই দুবাইকে চলে যেতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছিল, গ্রাউন্ডিংয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হওয়ায় বিদেশি বিমান নামার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু এখন সেই সমস্যাও নেই। এখন কোনো অজুহাত বিমান বিদেশি কোম্পানির বিমানকে নামতে দিচ্ছে না? বিদেশি কোম্পানি এলে একদিকে যেমন ভাড়া বৈষম্য দূর হতো, তেমনি যাত্রীদের দুর্ভোগও কমত। বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে তাদের এখন ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেতে হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিলেট ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার শরিফ আহমদ বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশের আপত্তির কারণে অন্য বিমান সিলেট এয়ারপোর্টে স্লট পাচ্ছে না’Ñ এ অভিযোগ সঠিক নয়। বিমানের আপত্তি করার কোনো কারণই নেই। বিষয়টির পূর্ণ এখতিয়ার সিভিল অ্যাভিয়েশনের, বিমানের নয়। তারাই নির্ধারণ করবে সিলেটে বিদেশি বিমান নামবে কি না। তিনি বলেন, প্রতিটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা তার ব্যবসাই আগে দেখবে। সে হিসাবে বিমান তার স্বার্থ দেখবেÑ এটাই স্বাভাবিক। তবে সিলেটে অন্য বিমান কোম্পানির ফ্লাইট পরিচালনা করতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বাধা দেবেÑ এ অভিযোগ সম্ভবত সঠিক নয়।
সূত্রমতে, সিভিল অ্যাভিয়েশন থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদেশি বিমানকে ওঠানামার অনুমতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বিশেষ আগ্রহে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়, যা এখন বাস্তবায়নের পথে। এ সময়ই প্রথম ধাপে ফ্লাই দুবাই ও এয়ার আরাবিয়াকে অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে শুধু ফ্লাই দুবাই সিলেট-দুবাই ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পায়। এ সময়ও আপত্তি জানায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার আপত্তির কারণে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিলেট বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ছাড়া বিদেশ থেকে আসা অন্য কোনো বিমানকে নামতে বা ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেয়নি। আগ্রহ প্রকাশ করলেও কূটকৌশলের কারণে বিশ্বের নামিদামি বিমান সংস্থা সিলেট থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সরকারকে বুঝিয়েছিল, অন্য সংস্থাগুলো সিলেট থেকে ফ্লাইট শুরু করলে বিমান তার ব্যবসা হারাবে। তারা উদারহণ হিসেবে ফ্লাই দুবাইকে সামনে নিয়ে আসে। ফ্লাই দুবাই তখন প্রতিদিন সিলেট থেকে কম খরচে সিলেট-দুবাই হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। লন্ডনের যাত্রীরাও বিমানের চেয়ে ফ্লাই দুবাইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় বিমানের ফ্লাইট এক অর্থে খালি যেত। অব্যাহত যাত্রী হারানোর ভয়েই রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাটি সিলেট থেকে বিদেশি বিমানের ওঠানামায় নিজেদের আপত্তিকে আরও জোরালো করে তোলে। বিমান এ অবস্থায় সিভিল অ্যাভিয়েশনকে বুঝিয়ে শেষমেশ বিদেশি বিমান সংস্থাকে ওসমানী বিমানবন্দর ব্যবহার করতে না দিতে সক্ষম হয়। বিমানের ‘লোকসান’ ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় আকাশ পরিবহন সংস্থাটির এই ‘অন্যায় আবেদন’ মেনে নিয়েছিল সিভিল অ্যাভিয়েশন। তারপর থেকে এককভাবে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সিলেট থেকে সীমিত রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, যাত্রীদের কাছ থেকে বিমানের নেওয়া ভাড়ার অঙ্ক অস্বাভাবিক এবং আজগুবি। ঢাকা-সিলেট-লন্ডন রুটে ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে একই ফ্লাইটে লন্ডনে গেলে যে ভাড়া দিতে হয় ঢাকার যাত্রীকে, সিলেট থেকে লন্ডনে যাতায়াতকারী যাত্রীকে তার থেকে অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হয়। একই ভাড়া পলিসি নির্ধারণ করা হয় লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় যাওয়া যাত্রীদের বেলায়ও। যারা সিলেটে নেমে যান, তাদের চেয়ে ১০-১৫ হাজার টাকা কম ভাড়ায় ঢাকা পর্যন্ত যাওয়া যায়।
সিলেটের একাধিক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক বলেন, এখন সব পাল্টেছে। কিন্তু ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে সেই বৃত্ত থেকে বের করে আনছে না সিভিল অ্যাভিয়েশন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কারণে সব সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকার পরও সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ বন্দরে পরিণত হতে দেওয়া হচ্ছে না।
সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার হাফিজ আহমদ বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের সক্ষমতা আছে বিদেশি বিমান ওঠানামা করানোর। সরকার অনুমতি দিলে যেকোনো বিমান এখানে নামতে পারবে। এখন খানিকটা সীমাবদ্ধতা থাকলেও বন্দর সম্প্রসারিত হলে স্লটও বাড়বে, সঙ্গে বাড়বে বহুমাত্রিক সুবিধা।
এনআরবি সোসাইটি যুক্তরাজ্যের সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রবাস বাংলা টিভির সিইও এম আহমদ জুনেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলেও বিদেশ থেকে শুধু দেশীয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সই এসে নামে, বিদেশি বিমান নয়। দেশীয় বিমান এসে নামলে সেটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয় না। নামকাওয়াস্তে একটি বিমানবন্দরের স্বপ্ন দেখেননি সিলেটবাসী এবং প্রবাসীরা। তিনি ম্যানচেস্টার ফ্লাইট সচল রাখা এবং সিলেট থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ছাড়াও অন্যান্য বিমান কোম্পানিকে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া এবং এ বিমানবন্দর থেকে তাদের ফ্লাইট পরিচালনার জন্য উৎসাহিত করতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। আহমদ জুনেদ বলেন, এবার সরকার পরিবর্তনের সেøাগান নিয়ে এসেছে। তাদের ইতিবাচক আগ্রহও আছে উন্নয়নের প্রতি, সিলেট ও প্রবাসীদের প্রতি। সরকারে আরিফুল হক চৌধুরী এবং হুমায়ুন কবিরের মতো দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তি আছেন, যারা আমাদের এই দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশকারী এবং আন্দোলনের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন