মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ঘনিয়ে উঠছে যুদ্ধের কালো মেঘ। বহু দফা আলোচনা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং যুদ্ধবিরতির নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি, সামরিক প্রস্তুতি এবং কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছেÑ যেকোনো সময় নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে। ইরানের শহর থেকে গ্রাম, এমনকি মসজিদগুলোতেও এখন যুদ্ধ প্রস্তুতির আবহ। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ইরানের শাসকগোষ্ঠী এটিকে ‘জাতীয় প্রতিরোধের প্রস্তুতি’ বললেও আন্তর্জাতিক মহলে এটি নতুন যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্রমেই কঠোর অবস্থানে যাচ্ছেন। চীন সফর শেষে দেশে ফিরে তিনি প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছেন, ‘সমঝোতা না হলে ইরানের জন্য খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।’ তার এই বক্তব্যের পর ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালি এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চাপা টানাপোড়েন চলছে। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ও টোল আদায় নিয়ে তারা নতুন পরিকল্পনা করছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘একটি নতুন ব্যবস্থার পথে হাঁটছে ইরান, যা শিগগিরই বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হবে।’ তেহরানের নতুন পরিকল্পনার আরেকটি দিক আরও বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরান এখন হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন যোগাযোগ কেবলের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব কেবল দিয়েই এশিয়া, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ও আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান হয়। ইরানি গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভবিষ্যতে ফি দিতে হতে পারে। না দিলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটতে পারে। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের নামও আলোচনায় এসেছে। যদিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ইরানকে অর্থ দেওয়া কার্যত অসম্ভব। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলার কৌশল। কারণ, সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংকিং, সামরিক যোগাযোগ, অনলাইন বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যভা-ার এবং বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এবার হামলার মাত্রা আগের চেয়ে আরও তীব্র হতে পারে। খবরে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য অভিযানে ইরানের সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এমনকি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করতে বিশেষ কমান্ডো অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ নিয়েও বিশেষ সামরিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, তারা যুদ্ধ ‘অত্যাসন্ন’ ধরে নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন কেবল ট্রাম্পের চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষা। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পূর্বের অভিযানের ধারাবাহিকতায় নতুন সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে বলেও আলোচনা চলছে।
সম্ভাব্য হামলার জবাব দিতে ইরানও বসে নেই। হরমুজ প্রণালি ঘিরে থাকা ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই পুনরায় সচল করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হলে তার অর্থনৈতিক মূল্যও ভয়াবহ হবে। তাঁর ভাষায়, ‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বা শেয়ারবাজারের পতনই শেষ কথা নয়; আসল দুর্ভোগ শুরু হবে যখন মার্কিন অর্থনীতি চাপে পড়বে।’
যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি তীব্র হচ্ছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও চালিয়ে যাচ্ছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান ফোনালাপে যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। দুই দেশই চাইছে, হরমুজ প্রণালির সংকট দ্রুত নিরসন হোক। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করেছেন। তাঁরা রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। চীনও কূটনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বেইজিং বলেছে, ‘শক্তি প্রয়োগ কোনো সমাধান নয়, সংলাপই একমাত্র পথ।’ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্যও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে চীন। রাশিয়াও সেই অবস্থানকে সমর্থন করেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাব এখন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গোপনে ইরানের ভেতরে হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতার মধ্যে লেবানন ও গাজাতেও সংঘাত থামছে না। লেবাননে নতুন করে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হিজবুল্লাহ। লেবাননের অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে গাজার খান ইউনিসসহ বিভিন্ন এলাকায়ও অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন মাত্রা পেলে তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বাণিজ্যিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন