× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০১:৪৭ এএম

অস্থিরতার কেন্দ্রজুড়ে নতুন সমীকরণ

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০১:৪৭ এএম

অস্থিরতার কেন্দ্রজুড়ে নতুন সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশে এখনো যুদ্ধের ধোঁয়া ভাসছে। হরমুজ প্রণালির ঢেউয়ে অস্থিরতা, উপসাগরীয় অঞ্চলে আতঙ্ক, বিশ্ববাজারে জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধি আর পরাশক্তিগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যেই শুরু হয়েছে এক জটিল কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতাকে নতুন করে যুদ্ধের দিকে না নিয়ে গিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা করছে একাধিক দেশ। আর এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রে উঠে এসেছে পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং চীন। তেহরানে এখন কূটনীতিকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তার সফরের আগে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি কয়েক দিন ধরে তেহরানে অবস্থান করে আলোচনার ভিত্তি প্রস্তুত করেন। এরপর তেহরানে পৌঁছে আসিম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে অংশ নেন। রাতভর চলা এই বৈঠককে সংশ্লিষ্ট মহল ইতিবাচক সংকেত হিসেবেই দেখছে।

কাতার ও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ : শুধু পাকিস্তান নয়, কাতারও আবার সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতার ভূমিকায় ফিরেছে। গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে আগে থেকেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত দেশটি এবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য সেতু হয়ে উঠতে চাইছে। ইতোমধ্যে কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছেছে। কাতারের এই তৎপরতার পেছনে রয়েছে বড় অর্থনৈতিক কারণ। ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তরলীকৃত গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস লাফান এলাকায় আঘাতের ফলে কাতারের গ্যাস রপ্তানির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ¦ালানি বাণিজ্য ভয়াবহ ধাক্কা খাবেÑ এমন আশঙ্কা থেকেই কাতার দ্রুত যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও সক্রিয় হয়েছে। কারণ নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে শুধু ইরান বা ইসরাইল নয়, পুরো উপসাগরীয় অর্থনীতি অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে। তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে, বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে যাবে এবং জ¦ালানি পরিবহন ঝুঁকিতে পড়বে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক উৎকণ্ঠা : বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ¦ালানি পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি এখন এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধের শুরুতে ইরান কার্যত প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। বহু দেশ জ¦ালানি সংকটে পড়ে এবং নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে থাকে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, গত চব্বিশ ঘণ্টায় অন্তত ২৫টি জাহাজ তাদের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তেলবাহী ট্যাংকার, কনটেইনারবাহী জাহাজসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক নৌযান এই পথে চলাচল করেছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনালাপে স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে সংকট আরও ভয়াবহ হবে। তিনি নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে অসমঝোতাযোগ্য নীতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত সংকেত : ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনো জটিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে তিনি আবার সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি বদল না হলে প্রেসিডেন্টের হাতে ‘বিকল্প ব্যবস্থা’ রয়েছে। রুবিওর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কূটনীতির পথ পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। তবে একই সঙ্গে সামরিক চাপ বজায় রাখতেও চাইছে। মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর দাবি, হোয়াইট হাউসে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও পরিস্থিতিকে ‘দোদুল্যমান’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বিষয়টি হয় নতুন যুদ্ধের দিকে যাবে, নয়তো একটি বড় সমঝোতায় পৌঁছাবে। তবে ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে সামরিক হুমকি ও অতিরিক্ত দাবি তুলে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে ফোনালাপে আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানই শান্তি আলোচনার প্রধান বাধা।

ইরানের কঠোর অবস্থান : তেহরান আপাতত নমনীয়তার আভাস দিলেও তাদের অবস্থান এখনো কঠোর। ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাই-নিক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরানের ‘ন্যায্য অধিকার’ স্বীকার করা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আর কোনো পথ নেই। তার মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই ছাড় দিতে হবে। ইরানি বিশ্লেষক ফুয়াদ ইজাদিও মনে করেন, তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা যাচাই করছে। তার মতে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে ওয়াশিংটন যদি বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করে, তাহলেই আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব।

পাকিস্তানের নতুন ভূমিকা : এই সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকাও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। ইসলামাবাদ এখন শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। এর আগে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যদিও সেটি স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি, তবু আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আসিম মুনিরের তেহরান সফর সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। পাকিস্তান চাইছে, যুদ্ধ যেন নতুন করে বিস্তার লাভ না করে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে। এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের চীন সফরও নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, বেইজিংও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে : মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। বিশেষ করে জ¦ালানি বাজারে অস্থিরতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ভারত ইতোমধ্যে গত কয়েক দিনের মধ্যে তিন দফা জ¦ালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সরকারি তেল কোম্পানিগুলো বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খরচ নয়, খাদ্যপণ্যসহ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো এখন আশঙ্কা করছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ¦ালানি সরবরাহব্যবস্থা বড় ধাক্কা খাবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়বে।

শান্তির পথ এখনো অনিশ্চিত : গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর বহু বৈঠক, ফোনালাপ ও কূটনৈতিক সফর হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরে। সব পক্ষই আপাতত আলোচনায় রয়েছে, তবে কেউ নিজেদের মূল অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেনি। তবু যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের মানুষ এখন কূটনীতির এই ক্ষীণ আলোতেই আশার রেখা খুঁজছে। কারণ, নতুন যুদ্ধ মানে শুধু আরও ধ্বংস নয়, বরং গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য নতুন বিপর্যয়। আর সে কারণেই তেহরান, দোহা, ইসলামাবাদ, ওয়াশিংটন ও বেইজিংÑ সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে : আলোচনার টেবিল কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের আগুন নেভাতে পারবে?

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!