মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং পারস্য উপসাগরজুড়ে অস্থিরতার পর এখন দুই দেশ একটি সম্ভাব্য সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতির আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছেÑ শান্তির টেবিলে বসলেও ইরান এখনো অস্ত্র নামিয়ে রাখেনি। তেহরানের ভাষায়, তারা ‘ট্রিগারে হাত রেখেই’ আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ভবিষ্যৎ পরমাণু আলোচনা শুরু করার রূপরেখাও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু শান্তির এই প্রচেষ্টার মধ্যেও দুই পক্ষের অবিশ্বাস, সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত অবস্থান স্পষ্টভাবে সামনে চলে এসেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম জানিয়েছে, তেহরান স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেÑ চুক্তির সময়েও যদি যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসী আচরণ করে, তাহলে এর জবাব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও কঠোর হবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অতীত কর্মকা- বিবেচনায় রেখে তারা সব সময় পূর্ণ প্রস্তুতিতে রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির আড়ালে প্রস্তুতি : ইরানের সামরিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য তারা ইতোমধ্যে নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা ও পাল্টা আক্রমণের কৌশল তৈরি করেছে। তাসনিমকে দেওয়া এক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ‘ভুল হিসাব’ করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালায়, তাহলে তারা ‘তৃতীয় ধাপের মোকাবিলার’ মুখে পড়বে। এই নতুন কৌশল আগের দুই সংঘাতের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের সতর্কতা : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘বিস্তৃত সমঝোতা’ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান ঘটবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, অধিকাংশ আলোচনা শেষ হয়েছে এবং এখন শুধু আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বাকি। তিনি আরও দাবি করেন, এই চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখবে। তবে তেহরানের অবস্থান অনেক বেশি সতর্ক। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফারস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি শেষ পর্যন্ত ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তারা ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলেও উল্লেখ করেছে। ইরান স্পষ্ট করেছে, প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হলেও আগের মতো ‘অবাধ চলাচল’ ফিরবে না।
হরমুজ ঘিরে বিশ্ব রাজনীতি : বিশ্ব জ¦ালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরান কার্যত এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেয়, ফলে বৈশ্বিক জ¦ালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে হরমুজ খুলে দেওয়ার আলোচনা চলছে।
পরমাণু ইস্যুতে অচলাবস্থা : সম্ভাব্য সমঝোতার সবচেয়ে জটিল অংশ হয়ে উঠেছে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। ওয়াশিংটন চাইছে, তেহরান এই মজুত অন্য দেশে হস্তান্তর করুক। কিন্তু ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে, তারা এতে রাজি নয়। রয়টার্সকে দেওয়া এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, বর্তমান প্রাথমিক সমঝোতায় পরমাণু ইস্যু অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য তোলা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আপাতত যুদ্ধবিরতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও মূল দ্বন্দ্ব এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন কূটনীতি : এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ খুব শিগগির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী দফার আলোচনা আয়োজন করতে চায় বলেও জানিয়েছে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা : সম্ভাব্য এই সমঝোতা নিয়ে সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে ফোনে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলে হরমুজে অবাধ নৌচলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মিশরও সব পক্ষকে কূটনৈতিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে।
‘ইরানই জিতেছে’Ñ ইসরাইলি বিশ্লেষণ : এই সংঘাত নিয়ে ইসরাইলের ভেতরেও ভিন্নধর্মী মূল্যায়ন সামনে এসেছে। দেশটির সাবেক জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান জিওরা আইল্যান্ড দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ‘অল্প ব্যবধানে হলেও ইরান বিজয়ী হয়েছে।’ তার মতে, পুরো যুদ্ধে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব অটুট ছিল এবং তারা নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক আলোচনায় তেহরানের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।
শান্তি নাকি বিরতির অপেক্ষা?
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা, অন্যদিকে পাল্টা হামলার প্রস্তুতিÑ দুই বাস্তবতা পাশাপাশি এগোচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে দ্রুত একটি রাজনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতে। ইরান চাইছে অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল এবং কৌশলগত স্বীকৃতি। কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং হরমুজের নিয়ন্ত্রণÑ এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। তেহরানের বক্তব্যে তাই শান্তির চেয়ে সতর্কতার সুরই বেশি স্পষ্ট। তারা আলোচনায় বসছে, কিন্তু আঙুল এখনো ট্রিগারের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সেই বাস্তবতাই হয়তো সবচেয়ে বড় বার্তা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন