প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে আবারও জেগে উঠছে এক পুরোনো আতঙ্ক। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, প্রকৃতির ভয়ংকর আবহাওয়া চক্র ‘এল-নিনো’ খুব দ্রুত ফিরে আসছে, আর এবার তা ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। কেউ কেউ একে এরই মধ্যে ‘দানবীয়’ বা ‘সুপার এল-নিনো’ নামে আখ্যা দিচ্ছেন। বিশ^ আবহাওয়া সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলছেন, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্টের মধ্যেই এল-নিনো গড়ে উঠতে পারে। বছরের শেষ দিকে সেটি আরও তীব্র হয়ে বিশ^জুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা, দাবানল এবং খাদ্যসংকটের কারণ হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আফ্রিকাÑ বিশে^র বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন কৃষক, জেলে ও নি¤œআয়ের মানুষ।
বৃষ্টির অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন কৃষকেরা : ফিলিপাইনের ছোট্ট শহর বোটোলানের ধানচাষি ফ্রইলান দিলাগ প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সাধারণত মে মাসের শেষ দিকেই সেখানে মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হয়। কিন্তু এবার মেঘ এলেও বৃষ্টি আসছে না। দিলাগের চোখে এখনো ভাসে ২০২৩-২৪ সালের এল-নিনোর স্মৃতি। তপ্ত রোদে জমি ফেটে গিয়েছিল। ধানের চারা শুকিয়ে মারা গিয়েছিল। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক কৃষক দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভয় হচ্ছে, এবারও হয়তো একই পরিস্থিতি হবে। যা রোপণ করব, তার অর্ধেকও হয়তো ঘরে তুলতে পারব না।’ শুধু ফিলিপাইন নয়, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার কৃষকেরাও একই শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে : বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল-নিনো সৃষ্টি হয় যখন মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানি অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে ওঠে। এই উষ্ণতা পৃথিবীর বায়ুম-লে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ফলে কোথাও ভয়াবহ খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দাবানলÑ আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক আন্দ্রেয়া তাশেত্তো জানিয়েছেন, বর্তমান তথ্য বলছে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি সবচেয়ে শক্তিশালী এল-নিনোর লক্ষণ। গত কয়েক দশকে মাত্র কয়েকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এবার সমুদ্রের গভীর স্তরেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু অঞ্চলে পানির শত শত মিটার নিচে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৬ ডিগ্রি বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উষ্ণতা পরে উপরিভাগের বাতাসকে আরও গরম করে তোলে এবং বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরন পাল্টে দেয়।
ভারতের জন্য বড় সতর্কবার্তা : ভারতের আবহাওয়া বিভাগ এরই মধ্যে সতর্ক করেছে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম হতে পারে। ভারতের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি এখনো বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৃষ্টি কমে গেলে ধান, গম, ডাল, তেলবীজসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। কেউ ভাবছেন তুলা চাষ করবেন, কেউ সয়াবিন। তুলা তুলনামূলকভাবে খরা সহ্য করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় জমি দখল করে রাখে। ফলে অন্য ফসলের সুযোগ কমে যায়। অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু বৃষ্টিপাত কমাই সমস্যা নয়, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াও বড় বিপদ। অতিরিক্ত গরমের কারণে সবজি, ধান, গম, ডাল, এমনকি ডিম ও মাংস উৎপাদনও কমে যেতে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ : ২০১৫ সালের শক্তিশালী এল-নিনোর সময় ভারতে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। মহারাষ্ট্রের কিছু এলাকায় সেই ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঋণে ডুবে বহু কৃষক চরম হতাশায় ভুগেছিলেন। সে বছর শুধু মহারাষ্ট্রেই চার হাজারের বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। একই সময়ে মালয়েশিয়ায় ধান ও পাম তেলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। পানির সংকট এতটাই তীব্র হয়েছিল যে কিছু এলাকায় পানি রেশনিং চালু করতে হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ায় দীর্ঘ খরার কারণে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। সেই আগুনের ধোঁয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, ওই দূষণের কারণে এক লাখের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছিল।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা : বিশ্লেষকেরা বলছেন, এল-নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। যদি ধান, গম, ভুট্টা, তেলবীজ এবং সবজির উৎপাদন কমে যায়, তা হলে খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়বে। এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে। বিশ্ব এমনিতেই যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহব্যবস্থার সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে আবার সার সংকটও দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থায় শক্তিশালী এল-নিনো পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার নি¤œআয়ের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। কারণ এসব দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো কৃষিনির্ভর এবং খাদ্য আমদানির ওপরও নির্ভরশীল।
মাছ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যেও বিপদ : এল-নিনোর প্রভাব শুধু জমিতে নয়, সমুদ্রেও পড়ে। সমুদ্রের পানি গরম হয়ে গেলে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হয়। অনেক মাছ গভীর সমুদ্রে চলে যায়, আবার কিছু প্রজাতি মারা যেতে পারে। ফলে জেলেদের আরও দূরে গিয়ে মাছ ধরতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে। আয় কমে যায়। ছোট নৌকার জেলেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামুদ্রিক খাদ্য সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি খাতেও চাপ : এল-নিনোর প্রভাব কৃষির বাইরে আরও বহু খাতে পড়তে পারে। মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে। কারণ খরার কারণে নদী ও জলাধারের পানি কমে যাবে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে, যা আবার পরিবেশ দূষণ বাড়াবে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বড় ডেটা কেন্দ্র পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়। পানির সংকট দেখা দিলে শিল্প ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামাজিক অস্থিরতার ভয় : ইতিহাস বলছে, বড় এল-নিনো শুধু আবহাওয়ার সংকট তৈরি করে না, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাও ডেকে আনতে পারে। ২০১৬ সালে ফিলিপাইনে খাদ্য সহায়তার দাবিতে হাজারো কৃষক সড়ক অবরোধ করেছিলেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হন। ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল-নিনোর সময় ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ খরা, দাবানল, খাদ্যসংকট এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। সেই অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত দেশটির দীর্ঘদিনের শাসক সুহার্তোর পতনের পথ তৈরি করেছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেলে এবং পানির সংকট তীব্র হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বিশ^কে প্রস্তুতির আহ্বান : জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এল-নিনো এমন এক সময়ে ফিরে আসছে যখন পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উষ্ণ। তাই এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এটি যেন উত্তপ্ত পৃথিবীর আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এখন থেকেই দেশগুলোকে প্রস্তুতি নিতে হবে। খরা মোকাবিলা, পানি সংরক্ষণ, কৃষকদের সহায়তা, খাদ্য মজুত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পরিকল্পনা প্রয়োজন। ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। প্রয়োজনে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। মালয়েশিয়াও পানি রেশনিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছেÑ এই প্রস্তুতি কি যথেষ্ট?
কারণ প্রকৃতি যখন রুদ্ররূপ ধারণ করে, তখন সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। মাঠের কৃষক, নদীর জেলে, শহরের শ্রমিকÑ সবাই তখন একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়ান। বিশ্বজুড়ে এখন তাই একটাই অপেক্ষাÑ প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ ঢেউ কতটা ভয়ংকর রূপ নেয়, আর মানবসভ্যতা সেই ধাক্কা সামাল দিতে কতটা প্রস্তুত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন