জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ও নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে বনায়ন ও বন সংরক্ষণের গুরুত্ব এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ুম-লে জমে থাকা অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রাকৃতিকভাবে শোষণ করে জীবদেহ ও মাটিতে জমা রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বনভূমি। তবে পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, শুধু অন্ধের মতো বিপুল পরিমাণ গাছ লাগালেই এই সংকটের সমাধান হবে না। জলবায়ু সুরক্ষায় বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন রক্ষা করা, পরিবেশের উপযোগী দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসারণ কমানোর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এ বিষয়ে পরিবেশবিজ্ঞানী ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, বনভূমি পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রাকৃতিক কার্বন ভান্ডার। গাছ যত বড় হয়, তত বেশি কার্বন দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করতে পারে। কিন্তু একটি পরিণত বন ধ্বংস করে নতুন গাছ লাগানো কখনোই সমপর্যায়ের পরিবেশগত সুবিধা দিতে পারে না। তার মতে, নতুন বনায়নের পাশাপাশি বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জলবায়ু গবেষক ড. নুসরাত জাহান বলেন, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় গাছ লাগানো সবচেয়ে কার্যকর। একই ধরনের একটি মাত্র প্রজাতির গাছ দিয়ে বিশাল এলাকা আচ্ছাদন করার পরিবর্তে বৈচিত্র্যময় বন গড়ে তুললে জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত থাকে। তিনি বলেন, বনভূমি শুধু কার্বন শোষণই করে না, বরং মাটির ক্ষয় কমায়, পানির চক্র বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে।
খুলনার শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আগে অনেক বেশি গাছ ছিল। এখন নতুন ভবন ও সড়ক নির্মাণের কারণে সবুজ কমে গেছে। পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো খুব প্রয়োজন।’ সিলেটের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকেও বৃক্ষরোপণে অংশ নিতে হবে।
বন বিশেষজ্ঞ ড. রাশেদুল করিম বলেন, বনায়নের সফলতা শুধু কতটি চারা রোপণ করা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। গাছগুলো বড় হয়ে টিকে থাকছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অনেক সময় চারা রোপণের পর নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না।
কৃষিবিজ্ঞানী ড. ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, কৃষিজমির উপযোগিতা বজায় রেখে কৃষি বনায়ন পদ্ধতি সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষক যেমন অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন, তেমনি কার্বন সংরক্ষণ ও মাটির উর্বরতাও বাড়বে। তার মতে, ‘ফলদ, কাঠজাতীয় ও ছায়াদানকারী দেশীয় গাছের সমন্বিত চাষ ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।’
রংপুরের কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, ‘বাড়ির চারপাশে গাছ লাগানোর ফলে গরম কিছুটা কম লাগে, আবার ফলও পাওয়া যায়।’ বরিশালের গৃহিণী রোকসানা বেগম বলেন, গ্রামে আগে অনেক বড় বড় গাছ ছিল। এখন আবার সবাই মিলে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিলে পরিবেশও ভালো থাকবে।
পরিবেশ নীতিবিদ ড. সায়মা রহমান বলেন, বনায়ন অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু এটি জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার কমানোর বিকল্প নয়। কার্বন নিঃসারণ কমানো এবং বন সংরক্ষণÑ দুটি কাজই একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাস্তার পাশে, নদীর তীরে, উপকূলীয় এলাকায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি অবৈধ বন উজাড় বন্ধ, বনভূমি দখল রোধ, বন ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বনায়ন প্রকৃতির কার্বন শোষণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যমান বন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ। সবুজে সমৃদ্ধ একটি পরিবেশ শুধু কার্বন ধারণের সক্ষমতাই বাড়াবে না, একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পানি নিরাপত্তা এবং মানুষের সুস্থ জীবনযাত্রার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করবে।

