ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী বেড়েছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এরই মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ হাজারের বেশি। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে হামও। মাত্র চার মাসে দেশব্যাপী হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ১ লাখ ২০ হাজারের ঘরে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগকে। তাই ডেঙ্গু বা হাম প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে সব মহলকে সঙ্গে নিয়ে সরকারকে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু বা হাম দুই রোগের শত্রুই পরিচিত। হাম প্রতিরোধে টিকা কার্যক্রম আরও জোরদার আর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা মারা কার্যক্রম বাড়ানোর কথা বলছেন তারা।
গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৪২ রোগী। যার মাধ্যমে জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১২ জন। রাজধানী ছাড়াও আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল বিভাগসহ দেশের প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলে। একইভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম সন্দেহে মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ সময় সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ছিল ৬৯৯ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত দেশব্যাপী নিশ্চিত হাম এবং সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭১০ জনে।
সরকার এপ্রিলেই দেশব্যাপী হামের টিকা কার্যক্রম শুরু করলেও তা সঠিকভাবে কার্যকর হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরাও। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এত দিনে সংক্রমণ কমে যাওয়ার কথা ছিল। কেন তা হচ্ছে না, বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। যারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেছে, তারা টিকা পেয়েছে। এখন ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, তাদের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করায় মৃত্যুহার কমছে না। আক্রান্ত শিশুদের শুরুতেই আইসোলেশনে রাখা, মাঝারি পর্যায়ে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিসেবা জোরদার করা জরুরি। শুধু আইসিইউনির্ভর চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যু কমানো যাবে না। রোগের শুরু থেকেই সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আইসোলেশন, অক্সিজেন ও পুষ্টিÑ এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা সরকারকে এখনই করতে হলেও সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না। কারণ কার বাড়িতে শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে তা সরকারের পক্ষ থেকে জানা সম্ভব না, যদি পরিবার না জানায়। তাই তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে হাম নিয়ন্ত্রণ কাজে যুক্ত করার তাগিদ দেন তিনি।
হামের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ রোধে অন্তর্বর্তী সরকার টিকাদানে অবহেলা উল্লেখ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন আবারও রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গত কয়েক বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়ার কর্মসূচি হয়নি। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়, তারাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) চালু করে বাংলাদেশ সরকার। পাঁচ বছরমেয়াদি এই কর্মসূচিটি স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের কাছে ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে বেশি পরিচিত। এটি বাস্তবায়ন করা হতো অপারেশন প্ল্যান (ওপি) তথা বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে। সেক্টর প্রোগ্রামের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় এত দিন সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো। এ ক্ষেত্রে টিকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সংস্থা গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ এত দিন টিকা কিনত ইউনিসেফের মাধ্যমে। ২০২২ সালে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারিসহ নানান কারণে সেটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময় বিভিন্ন খাতে সংস্কার নিয়ে নানান আলোচনার মধ্যে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়ে নিজেরা টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু মূলত তাদের কোনো অপারেশন প্ল্যানই ছিল না। এর ফলেই বর্তমান এই পরিস্থিতি বলেও মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে খুব শিগগিরই হাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করে তিনি বলেন, আমাদের টিকাদান কর্মসূচি চলমান রয়েছে। হামে আক্রান্তের সংখ্যাও এখন তুলনামূলক কম বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে ভরা মৌসুম হওয়ায় প্রতিদিন হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সাধারণত জুন-জুলাই মাসকে বলা হয় ডেঙ্গুর প্রজনন মৌসুম। তবে বর্ষাকাল আরেকটু বিস্তৃত হলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরেও থাকতে পারে এর প্রভাব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় পুরোটা সময় ডেঙ্গুর দাপট ছিল। যা চলতি বছরেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা সত্যিই আশঙ্কাজনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু বহন করে এডিস মশা। এই জাতের মশা নালা-নর্দমার নোংরা পানিতে জন্মায় না, বরং জন্মায় মানুষের ঘরের ভেতরে ও আশপাশে জমে থাকা অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার পানিতে। ছাদে ও বারান্দায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে, গাছের টব, ডাবের খোসা ইত্যাদিতে জমে থাকা পানিতে। বর্ষাকালে প্রায়ই থেমে থেমে বৃষ্টি হয় বলে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। তাই জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি ঘটে থাকে এবং এটাকেই ডেঙ্গু জ্বরের মৌসুম বলা হয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এখন যে পরিস্থিতি আমরা দেখছি, তাতে এটাকে সারা বছরের স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করাই সমীচীন। এই রোগ সংক্রমণ ও বিস্তারের প্রকৃতি লক্ষ করলে এটা এড়ানোর কিছু উপায় আমরা সহজেই অবলম্বন করতে পারি। সেটা হলো বাসাবাড়ির ভেতরে ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, যাতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকানো যায়। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের ভূমিকাও কম নয় বলে উল্লেখ করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী। তিনি বলেন, আমরা বরাবরই বলে আসছি ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। যা বছর শুরুর আগেই করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সম্প্রতি দেশজুড়ে টানা নি¤œচাপের কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে তীব্র বৃষ্টিপাত হয়েছে। আর এ কারণে এডিস মশা বৃদ্ধি পেয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস এ ব্যাপারে বলেন, নি¤œচাপের কারণে সারা দেশে গত কয়েক দিনে বিভিন্ন জায়গায় ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে, সেগুলো যদি আমরা পরিষ্কার করে ফেলি, তাহলে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দিনে-রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন