শ্রাবণের বারিধারায় এ কয়দিন ভুগেছে সারা দেশের মানুষ। টানা ১০ থেকে ১২ দিন তীব্র ও মাঝারি বৃষ্টিতে নাজেহাল হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। গত শনিবার থেকে আকাশের ঘন কালো মেঘকে সরিয়ে মাঝ আকাশে দেখা দিয়েছে সূর্যের ঝলক। যা গতকাল রোববারও অব্যাহত ছিল দেশজুড়ে। টানা বৃষ্টির ধকল কাটিয়ে নগরজীবনে স্বস্তি নামলেও রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলে বেড়েছে মশার উপদ্রব। যেহেতু এখন ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম, সেহেতু এডিসের জীবাণুবাহী ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে কিউলেক্স, অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া আতঙ্কেও ভুগছে সাধারণ মানুষ।
বৃষ্টির পরপরই রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলে রাস্তা, ড্রেন, খালি প্লট, নির্মাণাধীন ভবন, কারখানার আশপাশ এবং বাড়ির আঙিনায় জমে থাকা পানিতে বেড়ে গেছে মশার বংশবিস্তার। এতে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব মশা ধ্বংসে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়াসহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
সরেজমিনে রাজধানীর অনেক এলাকায় দেখা যায়, অনেক ড্রেন, খালি প্লট, নির্মাণাধীন ভবন, বাড়ির আঙিনা এবং সড়কের পাশে জমে থাকা পানি এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। অনেক সড়ক, নালা এবং বিভিন্ন স্থাপনার পাশে এখনো বৃষ্টির পানি জমে আছে। ড্রেনে আবর্জনা আটকে থাকায় পানি নামছে না। আবার কোথাও পরিত্যক্ত পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। এসব স্থানকেই মশার বংশবিস্তারের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর মগবাজার নয়াটোলা এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন মশার উপদ্রব কয়েকগুণ বেড়েছে। সন্ধ্যার পর দরজা-জানালা খুলে রাখা যায় না। ছোট শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। অনেক পরিবার প্রতিদিন কয়েল, অ্যারোসল ও বৈদ্যুতিক ব্যাট ব্যবহার করেও স্বস্তি পাচ্ছি না। তিনি বলেন, সারা দিন বাইরে কাজ করে বাড়ি এসে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই। মশার কারণে দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়। কয়েল জ্বালিয়েও মশা থেকে রেহাই পাচ্ছি না। ডেঙ্গুর ভয়ে ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
একই এলাকার অন্যান্য বাসিন্দা অভিযোগ করে, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ড্রেন পরিষ্কার এবং মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। অনেক এলাকায় মাঝেমধ্যে ফগার মেশিন ব্যবহার করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ করেন তারা। বিশেষ করে জলাবদ্ধ এলাকায় লার্ভা ধ্বংসে নিয়মিত কার্যক্রম না থাকায় সমস্যা থেকে যাচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা বলছেন, শুধু ধোঁয়া ছিটিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধন করলেই হবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা পরিষ্কার বা আধা-পরিষ্কার স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, অব্যবহৃত টায়ার, এসির ট্রে, ডাবের খোসা কিংবা যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে জ্বর, শরীর ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। শাহনাজ বেগম নামের এক গৃহবধূ বলেন, সন্ধ্যা হলেই ঘরে থাকার চেষ্টা করি। কয়েলের ওপর ভরসা পাই না। ডেঙ্গু মশা থেকে বাঁচতে ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য মশারি টাঙিয়ে রাখি। আমার বাচ্চার জ্বর হলে প্রথমেই ডেঙ্গুর ভয় কাজ করে। এলাকায় মশার জন্য প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে থাকতে হয়। বৃষ্টি থামার পর ভাবছিলাম স্বস্তি মিলবে। কিন্তু এখন মশার ভয়ে আর পারছি না।
একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাজধানীর শান্তিনগর এলাকার কর্মজীবী নারী সঞ্চিতা সীতু। তিনি বলেন, অফিসে কাজ করলেও সারাক্ষণ বাসায় ছেলেদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগি। গত কয়দিনের ব্যবধানে মশার তীব্রতা এত বেড়েছে যে, দরজা-জানালা ২৪ ঘণ্টা বন্ধ রেখেও কাজে দিচ্ছে না।
এ সময় একটু সচেতন থাকার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. সালেহ মোহাম্মদ তুষার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এখন ডেঙ্গুর সিজন। এ সময় যেন আশপাশে কোনো পানি জমা না থাকে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা, অব্যবহৃত টায়ার, এসির ট্রে, কিংবা যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা জরুরি। একটু বড় জামা-কাপড় পড়তে হবে, যেগুলোতে হাত আর পা ঢেকে রাখে।
তবে মশা নিধনে ফগার মেশিনের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত বা জমে থাকা পানিতে সহজে ব্যবহারযোগ্য নিরাপদ লার্ভানাশক (আইজিআর) ট্যাবলেট সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করা হলে এডিস নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অনেক প্রজননস্থলে স্প্রে কার্যকর হয় না। বরং ওয়াসার ওয়াটার মিটার হোলের মতো জায়গায় ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর (আইজিআর) ট্যাবলেট ব্যবহার করলে তা কয়েক মাস কার্যকর থাকে। কবিরুল বাশার বলেন, মানুষের ঘরে রাখা পানির ড্রাম বা বালতিতে সিটি করপোরেশন কীটনাশক ব্যবহার করতে পারে না। তাই এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আচরণ পরিবর্তন। নাগরিকদের পরামর্শ দিয়ে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার পানির পাত্র খালি করে ডিটারজেন্ট দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেমন একসময় হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা হয়েছিল, তেমনি পানির পাত্র পরিষ্কার রাখাও দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ জানেন এডিস মশা ডেঙ্গু ছড়ায়, কিন্তু নিজেদের বাড়িতে কোথাও মশার প্রজনন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করেন না। প্রত্যেক পরিবারকে নিশ্চিত করতে হবে, তাদের বাড়ি বা আঙিনায় যেন কোনোভাবেই এডিস মশার প্রজনন না হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন