ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

নির্বাচনি ইশতেহার ও বাস্তবায়ন

রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর খুব বেশি দিন বাকি নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে এরই মধ্যে। সবাই জনকল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন, যা আমাদের আশাবাদী যেমন করেছে, তেমনিভাবে মনে এক ধরনের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তাবোধের জন্ম দিয়েছে। আমাদের সবার প্রশ্ন, আসলেই কী এত সব কর্মসূচি, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সংস্কার করতে সক্ষম হবে আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা নতুন সরকার। আমরা আশাবাদী, আগামীর নেতৃত্ব হবে জনকল্যাণমূলক ও জনবান্ধব। সরকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জনমতের প্রাধান্য, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণসহ দুর্নীতির অবসানের মাধ্যমে দেশকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে নেবে এবং সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। নির্বাচন মানেই প্রতিশ্রুতি। নির্বাচন ও প্রতিশ্রুতি শব্দ দুটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

নির্বাচনের সময় প্রত্যেক প্রার্থী নিজ দলের কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহীত নির্বাচনি ইশতেহারের বাইরে গিয়ে নিজ এলাকার জনজীবনের উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাধ্যমে প্রার্থীরা নিজের প্রতি জনগণের সহানুভূতি ও বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রতিশ্রুতির কতটুকু রক্ষা করেন, তা সময়ই বলে দেয়। নির্বাচন হলো প্রতিনিধি বাছাইয়ের মাধ্যম। আর তা যত সুষ্ঠু হবে ততই জনগণের আশা-প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে। সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমেই ভোটাররা তাদের পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। এর মাধ্যমেই জনগণ শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করে থাকে। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন, সর্বক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণই নির্বাচনের বৈধতা নিশ্চিত করে। কিন্তু সেখানে যদি জনগণ তাদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয় তা হলে তা প্রশাসন তথা দেশের ব্যর্থতারই পরিচয় বহন করে।

নির্বাচন আসন্ন হলেই প্রার্থীরা ছুটে বেড়ান পথে-প্রান্তরে, ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। তখন তারা বিভিন্ন এলাকার সবচেয়ে নি¤œআয়ের লোকের কাছে যেতেও দ্বিধান্বিত হন না। সর্বসাধারণের দ্বারে দ্বারে নিজের জন্য ভোট প্রার্থনা করেন। সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নে নিজের অবদান জনগণের সামনে তুলে ধরেন। জনগণকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। এ সময় বিরোধী দলের নিন্দা আর নিজ দলের উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রশংসা করা তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। নির্বাচন এলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে নির্বাচনি ইশতেহার, যা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবেও পরিগণিত।

নির্বাচনের সময়েই প্রত্যেক প্রার্থী নির্দিষ্ট এলাকার উন্নয়নকল্পে জনগণের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত ইশতেহার প্রণয়ন করেন এবং তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। এমনকি বিভিন্ন পথসভা, মিটিং-মিছিল, লিফলেটের মাধ্যমে তার প্রতিশ্রুতিসমূহ প্রচার করে থাকেন। তবে দুঃখের বিষয়, নির্বাচিত হওয়ার পরে অনেক সময়ই প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির দিকে ভ্রুক্ষেপই করেন না। তা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন তারা হয়ে ওঠেন আত্মকেন্দ্রিক। যাদের ভোটে নির্বাচিত নেতা, সেই ভোটাররাই হয়ে যায় উপেক্ষিত।

তখন তারা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ভুলে যান। ভুলে যান জনগণের কষ্ট ও দুর্দশার কথা। যে বা যারা নির্বাচনের সময় জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারাও ভুলে যান যে জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করা তাদের একান্ত কর্তব্য। বরং, যারা ভোটের জন্য জনগণের কাছে ধরনা দিত, নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের কাছেই জনগণকে বারবার ধরনা দিতে হয়। মাঝেমধ্যেই শোনা যায়, নির্বাচিত হওয়ার পর নির্বাচিত প্রার্থীর কোনো সাক্ষাৎই ভোটাররা পায় না।

বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় অনেক প্রতিশ্রুতি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন জনপ্রতিনিধি চাইলেই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারেন। কিন্তু আইনি কাঠামো, বাজেট সীমাবদ্ধতা, কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার বিভাজন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জনপ্রতিনিধিদের অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা জানা সত্ত্বেও অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া সেটিই দায়বোধহীন আচরণ। ভোটাররা কি পাঁচ বছরের জন্য নীরব দর্শক? গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো ভোটই শেষ কথা। ভোটের পর বেশির ভাগ নাগরিক হয়তো বিশ্রাম নেন, কিন্তু প্রশ্ন করেন না। ভোট দেওয়ার পর জনপ্রতিনিধির কাজের হিসাব চাওয়ার প্রবণতা খুব কম। ফলে প্রতিশ্রুতি ভাঙলে বড় কোনো চাপ তৈরি হয় না। এই নীরবতাই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়; অনেক দেশেই ভোটাররা নির্বাচনের পর বেশিদিন সক্রিয় থাকেন না।

কিন্তু গণতন্ত্রের মূল শক্তি ওই সক্রিয় নাগরিক পর্যবেক্ষণ না হলে সরকার ও প্রতিনিধিদের আসা যাওয়াই অবান্তর হয়ে পড়ে। প্রতিশ্রুতি যাচাই : সত্য মিথ্যার বাইরের প্রশ্ন, কোন নেতা কী বলেছেন, তা সত্য না মিথ্যা এটি যাচাই করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু একটি প্রতিশ্রুতি কতটা এগোল, আদৌ শুরু হলো কি না, নাকি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ রইলÑ এটি বোঝা অনেক বেশি জটিল। প্রতিশ্রুতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আজ যে প্রকল্প ‘পরিকল্পনায়’, কয়েক মাস পর সেটি ‘স্থগিত’ বা ‘বাতিল’ও হতে পারে। তাই কেবল ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’ বললে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। দরকার ধারাবাহিক, সময়ভিত্তিক ও প্রমাণভিত্তিক নজরদারি।

নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে অজস্র প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিপ্লবÑ প্রায় প্রতিটি দলই ভোটের আগে এমন সব অঙ্গীকার তুলে ধরে, যা শুনতে আশাব্যঞ্জক, কিন্তু বাস্তবায়ন প্রশ্নে থেকে যায় বড় সংশয়। ভোটারদের মনে তাই পুরোনো প্রশ্নটি আবার জেগে ওঠেÑ এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত; আর দলগুলো কতটা আন্তরিকভাবে তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ? নির্বাচনি ইশতেহার মূলত একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার দলিল। এতে দল তাদের নীতিগত অবস্থান, অগ্রাধিকার খাত এবং উন্নয়ন কৌশল তুলে ধরে। ইশতেহার হওয়া উচিত বাস্তবভিত্তিক, পরিমাপযোগ্য এবং সময়সীমা নির্ধারিত প্রতিশ্রুতির সমন্বয়।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ ইশতেহারেই থাকে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, কিন্তু সেগুলো অর্জনের রূপরেখা অস্পষ্ট। কীভাবে অর্থায়ন হবে, কোন আইনি বা প্রশাসনিক সংস্কার লাগবে, কী বাধা আসতে পারেÑ এসব বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা কমই থাকে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান নতুন নয়। অতীতের নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলগুলো ইশতেহারের কিছু অংশ বাস্তবায়ন করলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার আংশিক বা পুরোপুরি অপূর্ণ থেকে যায়। এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে।

যেমনÑ প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা; কখনো কখনো সদিচ্ছার অভাব। তবে এটাও সত্য, সব প্রতিশ্রুতি সমানভাবে অবাস্তব নয়। অনেক সময় বড় প্রকল্প বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ইশতেহার থেকেই বাস্তব রূপ পেয়েছে। সমস্যা হলো, ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, সেগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কম থাকে। কোন প্রতিশ্রুতি আগে, কোনটি পরে, তা নিয়ে জনগণের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছায় না।

ফলে ভোটাররা বুঝতে পারে না, দলটি সত্যিই তাদের দেওয়া অঙ্গীকার পূরণে কতটা অগ্রসর হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহি। নির্বাচনি ইশতেহারকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক দলিল হিসেবে দেখা হয় না। ফলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য রাজনৈতিক বা আইনি শাস্তির মুখে পড়তে হয় না দলগুলোকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটই একমাত্র বড় জবাবদিহির মাধ্যম। কিন্তু ভোটারদের সামনে ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে নিরপেক্ষ ও সহজবোধ্য মূল্যায়ন খুব কমই হাজির করা হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোও সচরাচর নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের হার প্রকাশ করে না, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগে শুধু প্রতিশ্রুতি প্রচার নয়, বরং আগের ইশতেহারের কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তার তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে ভোটাররা তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারবেন। উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে ম্যানিফেস্টো ট্র্যাকার বা প্রতিশ্রুতি পর্যবেক্ষণব্যবস্থা রয়েছে, যা আমাদের দেশেও চালু করা যেতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার প্রশ্নে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। অনেক সময় ইশতেহার প্রণয়ন করা হয় সীমিত পরিসরে; শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে। তৃণমূলের মতামত, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ বা বাস্তব তথ্যের প্রতিফলন সেখানে কম থাকে। ফলে ইশতেহার হয়ে ওঠে বেশি প্রচারধর্মী, কম কর্মযোগ্য। অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় ইশতেহার তৈরি হলে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বাড়ে। ভোটারদের মনস্তত্ত্বও এখানে ফ্যাক্টর। বড় প্রতিশ্রুতি ভোট টানতে সাহায্য করেÑ এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাই দলগুলো অনেক সময় জানার পরও যেসব প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়, তবু তা ইশতেহারে রাখে। এই প্রবণতা বদলাতে হলে ভোটারদের মধ্যেও বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা ও নীতিনির্ভর ভোটদানের সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে।