বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু সংকট এসেছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি, দুর্ভিক্ষÑ সবকিছুর মধ্যেও একটি বিষয়ে রাষ্ট্র কখনো আপস করেনি : শিশুদের জীবন রক্ষায় টিকাদান কর্মসূচি। হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকারের মতো ভয়াবহ রোগকে নিয়ন্ত্রণে আনার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। সেই শক্তিশালী ব্যবস্থাকে অবহেলা, অদূরদর্শিতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ভেঙে পড়তে দেওয়া কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি এক নির্মম ব্যর্থতা।
১২ মে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর হামের টিকা সংগ্রহের পুরোনো পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল। সে সময় ইউনিসেফের কর্মকর্তারা একাধিকবার সরকারের উচ্চপর্যায়ে সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, নতুন সিদ্ধান্ত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। টিকা সংগ্রহে ১২ মাস বিলম্ব ঘটবে। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকেও বারবার সতর্ক করেছিলেন। তবে কেউ শোনেননি তার কথা। ফলে আজ দেশের ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি তথ্যেই শত শত শিশু প্রাণ হারিয়েছে। হাজার হাজার শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অসংখ্য মা-বাবা সন্তানকে বুকে নিয়ে কাঁদছেন। এই কান্না শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক নীরব অভিযোগ। প্রশ্ন একটাইÑ এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?
হাম এমন কোনো রোগ নয়, যার প্রতিরোধের উপায় নেই। বহু বছর ধরেই টিকা দিয়ে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ শিশুগুলোর মৃত্যু অনিবার্য ছিল না। সময়মতো টিকা, যথাযথ নজরদারি এবং কার্যকর জনসচেতনতা থাকলে তাদের অধিকাংশই আজ বেঁচে থাকত। তাই এই মৃত্যুগুলোকে কেবল ‘দুর্ভাগ্য’ বলে পাশ কাটানো সত্যকে আড়াল করার শামিল।
যখন টিকা সংগ্রহের পরীক্ষিত ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হলো, তখন সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সম্ভাব্য বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা দিয়েছিল। জানানো হয়েছিল, সরবরাহে বড় ধরনের বিলম্ব ঘটতে পারে এবং শিশুদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। কিন্তু সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা যেন বাস্তবতার চেয়ে নিজেদের অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এর ফল আজ দেশের প্রতিটি শিশু হাসপাতালের করিডরে দৃশ্যমান।
একটি রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। আর শিশুদের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব আরও বড়। কারণ তারা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্র, নীতি নির্ধারণ করে সরকার, ব্যবস্থা পরিচালনা করে প্রশাসন। সেই রাষ্ট্র যদি টিকার মজুত শূন্যে নেমে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটি নিছক গাফিলতি নয়Ñ এটি দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতা।
শুধু টিকার সংকটই নয়, পুষ্টিহীনতা, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, ভিটামিন এ কর্মসূচির দুর্বলতা, গুজব মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং হাসপাতালের আইসিইউ সংকটÑ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। কিন্তু এসবের কোনোটিই হঠাৎ তৈরি হয়নি। এগুলো দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। যে প্রশাসন সময়মতো সমস্যাগুলো শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে না, তাদের ব্যর্থতার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ, আর সবচেয়ে করুণভাবে দেয় শিশুরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ এত মৃত্যু ও সংক্রমণের পরও এখনো দায়িত্ব নির্ধারণের স্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যায় না। কে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? কেন সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করা হয়েছিল? কেন টিকার মজুত শূন্যে নামল? কেন মাঠপর্যায়ে ঘাটতি পূরণ হয়নি? এসব প্রশ্নের জবাব জাতি জানতে চায়। দায় এড়ানোর সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
শিশুদের মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষা। অনেক সন্তান হয়তো বহু বছরের প্রার্থনার ফল ছিল। সেই শিশুর ছোট্ট কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো কর্মকর্তা বা নীতিনির্ধারক যদি বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে’, তবে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।
রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি যাচাই হয় দুর্বলদের সুরক্ষায়। শিশুদের রক্ষা করতে না পারলে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোÑ সব অর্জনই অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ সভ্যতার প্রকৃত মানদ- হলো সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে।
এখন প্রয়োজন জরুরিভিত্তিতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজন হলে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের আইসিইউ ব্যবহার করতে হবে। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী সংকট দূর করতে হবে। গুজব প্রতিরোধে জাতীয়ভাবে প্রচার চালাতে হবে। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্তগত ব্যর্থতা চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
দায় স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; এটি দায়িত্বশীলতার প্রমাণ। যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের উচিত জনগণের সামনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া। শিশুদের জীবন নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার অধিকার কারো নেই। প্রশাসনিক ভুলের মূল্য কচি প্রাণের বিনিময়ে চুকানো যায় না।
বাংলাদেশ বহু সংকট মোকাবিলা করেছে। এই সংকটও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে নাÑ যে শিশুগুলো আর ফিরে আসবে না, তাদের মৃত্যুর দায় ইতিহাস নীরবে লিখে রাখবে। পদ-পদবি, ক্ষমতা কিংবা ব্যাখ্যা দিয়ে সেই দায় মুছে ফেলা যাবে না।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই মানবিক হয়, তবে শিশুদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বলতে হবেÑ হ্যাঁ, ভুল হয়েছে; এবং এই ভুলের পুনরাবৃত্তি আর কখনো হতে দেওয়া হবে না। যতদিন সেই স্বীকারোক্তি ও জবাবদিহি না আসে, ততদিন প্রতিটি শিশুমৃত্যু আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে যাবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন