× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব, গবেষক ও কলামিস্ট; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

মানহীন উচ্চশিক্ষায় থমকে যাচ্ছে বাংলাদেশ

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব, গবেষক ও কলামিস্ট; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

মানহীন উচ্চশিক্ষায় থমকে যাচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। স্মার্ট বাংলাদেশ, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবÑ এসব শব্দ এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছেÑ যে উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ভর করে একটি জাতি জ্ঞান, দক্ষতা ও নেতৃত্ব গড়ে তোলে, সেই ব্যবস্থাই যদি মানহীনতার সংকটে নিমজ্জিত হয়, তবে উন্নয়নের এই স্বপ্ন কতটা বাস্তব? আজ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এমন এক সংকটময় অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু বাড়ছে না দক্ষ জনশক্তি, গবেষণা কিংবা কর্মসংস্থান। ফল শিক্ষিত বেকারের দীর্ঘ সারি, হতাশ তরুণ সমাজ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ।

বর্তমানে দেশে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হাজারো কলেজে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম চলছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করছে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েটের একটি বড় অংশ শ্রমবাজারে অযোগ্য কিংবা অনুপযোগী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইওউঝ)-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর ২৮.২৪ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট বেকার। নারী গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৪ শতাংশেরও বেশি। গবেষণায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে যোগাযোগ দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ইইঝ) সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশের বেশিÑ যা অন্যান্য শিক্ষাগত স্তরের তুলনায় সর্বোচ্চ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও তরুণরা কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ডিগ্রি যেন হতাশার আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষা এখনো অনেকাংশে সনদকেন্দ্রিক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে সনদ বিতরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার মাধ্যমে পাস করানো হচ্ছে, কিন্তু তাদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা কিংবা নেতৃত্ব বিকাশের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমের সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার বিশাল ফারাক আজ স্পষ্ট। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল মার্কেটিং ও সফট স্কিলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অথচ দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক সিলেবাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়ে বের হলেও বাস্তব কাজের দক্ষতায় পিছিয়ে থাকছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (টএঈ) বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণাগার, লাইব্রেরি ও আধুনিক শিক্ষা-উপকরণের অভাব রয়েছে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাস ও গবেষণার ন্যূনতম পরিবেশ পর্যন্ত নেই। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন।

গবেষণার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান হতাশাজনক। বিশ্বের শীর্ষ ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের খুব কম বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পায়। গবেষণা প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পেটেন্ট উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত অবদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো অনেক পিছিয়ে। এই ব্যর্থতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো গবেষণায় অপ্রতুল বিনিয়োগ। উন্নত দেশগুলো জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করলেও বাংলাদেশে এই খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত কম। ফলে শিক্ষকরা গবেষণার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা অতিরিক্ত বাণিজ্যিক কর্মকা-ে বেশি সময় ব্যয় করতে বাধ্য হন।

আরেকটি বড় সংকট হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণ। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পায়। এর ফলে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকরা নিরুৎসাহিত হন। ক্যাম্পাসে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সেশনজট, সংঘাত ও অস্থিরতার মধ্যে আটকে পড়ে। উচ্চশিক্ষার এই মানহীনতা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতি করছে না; এটি দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের গতিকেও থামিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।

বিশ্বব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ বেকার ঘুরছেন। এই বৈপরীত্যই আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তোলে। বর্তমান বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক না করলে বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়বে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা।

এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমকে আন্তর্জাতিক মানের ও শ্রমবাজার উপযোগী করতে হবে। শিল্প খাত, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণায় বড় বিনিয়োগ ছাড়া উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। গবেষণা অনুদান বাড়াতে হবে, আধুনিক ল্যাব ও লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পাঠদান নয়, জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চতুর্থত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তিই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল ও উদ্যোক্তা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এখন শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা নয়; বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিকে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজই এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু সেই শক্তিকে যদি মানহীন শিক্ষার কারণে অদক্ষ ও হতাশ করে তোলা হয়, তবে উন্নয়নের সব অর্জন একসময় থমকে যাবে। একটি জাতির অগ্রযাত্রা নির্ভর করে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, গবেষণার শক্তি ও তরুণদের দক্ষতার ওপর। তাই উচ্চশিক্ষাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। আজ সময় এসেছে উচ্চশিক্ষাকে সনদের গ-ি থেকে বের করে বাস্তব জ্ঞান, গবেষণা, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে জমে থাকা এই অন্ধকার একসময় পুরো জাতির ভবিষ্যৎকেই গ্রাস করবে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!