সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সি নিষ্পাপ শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম হত্যাকা- শুধু একটি পরিবারের আলোকই নিভিয়ে দেয়নি, বরং সমগ্র নগরজীবনের নিরাপত্তাবোধকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। যে বয়সে একটি শিশুর ঘরের বাইরে কিংবা পাশের ফ্ল্যাটে মনের আনন্দে খেলে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে তাকে শিকার হতে হলো চরম নৃশংসতার। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমাদের চেনা শহরটি অবুঝ শিশুদের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। মহানগরীর ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ভয়াবহতা আজ প্রত্যেক অভিভাবককে এক চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে যখন জানা গেল, পাশের ফ্ল্যাটে বসবাসকারী এক দম্পতি এই হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টার সঙ্গে জড়িত ছিল। এই তথ্যটি আমাদের বর্তমান সমাজের জন্য এক চরম উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। একসময় ‘প্রতিবেশী’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত পারস্পরিক ভরসা, স্নেহ আর সুরক্ষার এক অলিখিত চুক্তি। কিন্তু আজ সেই প্রতিবেশীর ঘরই যখন একটি শিশুর জন্য কসাইখানায় পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কোন অতল গহ্বরে গিয়ে ঠেকেছে।
একটি আধুনিক বহুতল ভবনের ভেতরে, সম্পূর্ণ পরিচিত এবং সুরক্ষিত মনে হওয়া পরিবেশে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটতে পারে, এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমাদের প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। আমরা সিসিটিভি ক্যামেরা আর দারোয়ান দিয়ে ভবন মুড়ে রাখলেও, ভেতরের মানুষের মনের অন্ধকার দূর করতে পারছি না। আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট কালচারের যান্ত্রিকতা আমাদের এতটাই আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে যে, পাশের ফ্ল্যাটে কী ঘটছে বা কোনো শিশু বিপদে পড়েছে কি না, তার খবর নেওয়ার ন্যূনতম ফুসরতও আমাদের থাকছে না।
এ ধরনের পৈশাচিক ঘটনার পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলোÑ দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। এর মূল লক্ষ্য একটাই ভবিষ্যতে যেন আর কোনো অপরাধী এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়। বিচারহীনতা কিংবা বিচারের দীর্ঘসূত্রতা সমাজে অপরাধের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যখন কোনো অপরাধী দেখে যে অপরাধ করেও বছরের পর বছর পার পেয়ে যাওয়া যায়, তখন তার অপরাধ করার প্রবণতা আরও বাড়ে।
এখানে মনে রাখা দরকার, দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়া করে বা দায়সারাভাবে বিচার সম্পন্ন করা নয়। প্রকৃত ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, অকাট্য বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক প্রমাণ, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত রায় প্রদান। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে যদি তদন্তে কোনো ফাঁকফোকর থেকে যায়, তবে অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে। তাই পুলিশ ও প্রসিকিউশনকে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মামলাটি সাজাতে হবে, যেন আদালতে অপরাধ প্রমাণে কোনো সন্দেহ না থাকে।
এ ধরনের স্পর্শকাতর অপরাধের বিচার যদি বছরের পর বছর বিলম্বিত হয়, তবে এর সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক রূপ ধারণ করে। প্রথমত, ভুক্তভোগী পরিবারটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে নিমজ্জিত হয় এবং একসময় বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা কমতে শুরু করে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বিপজ্জনক প্রবণতাও এর থেকেই তৈরি হয়। বিলম্বিত বিচার প্রকারান্তরে অপরাধীদের এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সুবিধা ও সাহস জুগিয়ে থাকে।
ঢাকার মতো মেগাসিটিতে শিশুদের বড় হয়ে ওঠার পরিবেশ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। কোনো খেলার মাঠ নেই, উন্মুক্ত বাতাস নেই। চার দেয়ালের বন্দি জীবনে শিশুরা তীব্র একাকিত্বে ভোগে। একটু বিনোদন বা সঙ্গের আশায় তারা অনেক সময় সহজেই অপরিচিত বা আধা-পরিচিত মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অপরাধীরা শিশুদের এই সরলতা ও নিঃসঙ্গতার সুযোগ নেয়। আমাদের যান্ত্রিক নগর পরিকল্পনা শিশুদের মানসিক বিকাশকে যেমন বাধাগ্রস্ত করছে, তেমনি তাদের এক ধরনের অদৃশ্য ঝুঁকির মুখেও ঠেলে দিচ্ছে।
রামিসা হত্যাকা-ের মতো জটিল ও ক্লুলেস মামলার রহস্য উন্মোচনে ডিজিটাল ফরেনসিক এবং তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ট্র্যাকিং এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট ল্যাবের সঠিক ব্যবহার মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের তদন্ত সংস্থাকে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। সনাতন পদ্ধতির তদন্তের চেয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আদালতে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য এবং এর ওপর ভিত্তি করে দ্রুত রায় দেওয়া সম্ভব হয়।
নগরীর ফ্ল্যাট কেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা আমাদের এক ধরনের ছদ্ম-নিরাপত্তা দিলেও, মানসিকভাবে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকছেন, তাদের পেশা কী বা তাদের আচরণ কেমন তা আমরা অনেকেই জানি না। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অপরাধীদের জন্য একটি চমৎকার সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। তারা জানে যে তারা ভেতরে যা-ই করুক না কেন, বাইরের কেউ সহজে উঁকি দিতে আসবে না। এই অচলায়তন ভাঙতে হবে, অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে প্রতিবেশীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করা দরকার।
আমাদের দেশে শিশু সুরক্ষার জন্য বিশেষায়িত ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বড় অভাব রয়েছে। কোনো শিশু নিখোঁজ হলে বা বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে যে ধরনের জরুরি রেসপন্স সিস্টেম বা উদ্ধার তৎপরতা প্রয়োজন, তা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। জাতীয় হেল্পলাইন ৯৯৯ কিছুটা ভূমিকা রাখলেও তৃণমূল পর্যায়ে বা পাড়া-মহল্লায় শিশু সুরক্ষায় কোনো নজরদারি টিম নেই। প্রতিটি ওয়ার্ড বা এলাকায় শিশু অধিকার ও সুরক্ষা কমিটি থাকা উচিত, যারা শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকির বিষয়গুলো তদারকি করবে।
এই হত্যাকা-ে এক দম্পতির জড়িত থাকার বিষয়টি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির এক নতুন ও ভয়াবহ দিক উন্মোচন করে। পারিবারিক পরিবেশে স্বামী-স্ত্রী মিলে যখন একটি শিশুকে হত্যার পর লাশ গুমের পরিকল্পনা করে, তখন বুঝতে হবে আমাদের পারিবারিক কাঠামোর ভেতরেও বড় ধরনের পচন ধরেছে। মাদকাসক্তি, অনৈতিক পরকীয়া, অতি লোভ কিংবা চরম মানসিক বিকৃতির পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। এ ধরনের ঠান্ডা মাথার অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা সমাজবিজ্ঞানীদের জন্যও এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
শিশু পর্নোগ্রাফি, শিশুহত্যা বা নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়া উচিত। সংবাদ প্রকাশের সময় ভুক্তভোগী শিশুর মর্যাদা এবং তার পরিবারের মানসিক অবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা দরকার। একই সঙ্গে অপরাধের বীভৎসতার চেয়ে অপরাধীদের আইনি শাস্তির বিষয়টি বেশি ফোকাস করা উচিত। গণমাধ্যম যদি ধারাবাহিকভাবে এই মামলার ফলোআপ রিপোর্ট প্রকাশ করে, তবে প্রশাসনের ওপর একটি ইতিবাচক চাপ বজায় থাকে এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
শিশুদের আত্মরক্ষার প্রাথমিক পাঠ স্কুল এবং পরিবার থেকেই দেওয়া উচিত। ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ কিংবা বিপদে পড়লে কীভাবে চিৎকার করতে হবে বা কার সাহায্য চাইতে হবে তা শিশুদের সহজ ভাষায় শেখানো দরকার। শিশুদের শেখাতে হবে যে চেনা মানুষও অনেক সময় ক্ষতিকর হতে পারে। এই ধরনের সচেতনতামূলক শিক্ষা শিশুদের মনের ভয় দূর করে এবং তাদের সতর্ক হতে সাহায্য করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জিপিএ-৫ এর পেছনে না ছুটিয়ে জীবনমুখী এই শিক্ষাগুলো দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত।
যখন কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রে শিশু হত্যাকারীদের দ্রুত এবং সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি করা হয়, তখন অপরাধ জগতের ভেতরে একটি তীব্র ভয়ের বার্তা পৌঁছায়। ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদ-ের মতো কঠোর সাজা যখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর হয়, তখন তা সম্ভাব্য অন্য অপরাধীদের হাতকে কাঁপিয়ে দেয়। এটি সমাজে এক ধরনের ‘ডিটারেন্ট’ বা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। রামিসার পরিবার হয়তো তাদের সন্তানকে আর ফিরে পাবে না, কিন্তু এই দৃষ্টান্তমূলক বিচার আগামী দিনের হাজারো রামিসাকে রক্ষা করতে পারে।
এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলায় অনেক সময় প্রতিবেশীরা বা প্রত্যক্ষদর্শীরা অপরাধীদের ভয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না। আমাদের দেশে সাক্ষী সুরক্ষা বা ‘উইটনেস প্রটেকশন’ এর শক্তিশালী আইনি কাঠামো না থাকায় অনেকেই ঝামেলা এড়িয়ে চলেন। এর ফলে অনেক সময় শক্তিশালী মামলাও প্রমাণাভাবে ভেস্তে যায়। সরকারকে অবশ্যই এই মামলার সাক্ষীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা কোনো ভয় বা প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে আদালতে সত্য সাক্ষ্য দিতে পারেন।
আমরা প্রায়শই এ ধরনের ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ মনে করি। কিন্তু বাস্তব জমিনে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ায় নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য। আমাদের পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। তরুণদের অপরাধমূলক গ্যাং কালচার থেকে দূরে রাখতে হবে। নাগরিক সমাজ যদি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মিলে একটি নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, তবে অপরাধীরা কোনো এলাকাতেই সহজেই আস্তানা গেঁড়ে বসতে পারবে না।
শিশু নির্যাতন ও শিশু হত্যার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেলটি কেবল রামিসা আক্তারের মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখবে। তারা নিশ্চিত করবে যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মামলার কার্যক্রম থমকে না যায়। রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা যদি শিশুদের ঘরের পাশেও নিরাপত্তা দিতে না পারি, তবে আমাদের সমস্ত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়বে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন