× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০১:০৩ এএম

আলহামদুলিল্লাহ : মানবসমতার শক্তিশালী দর্শন

এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০১:০৩ এএম

আলহামদুলিল্লাহ : মানবসমতার শক্তিশালী দর্শন

আজকের পৃথিবী অসীম ক্ষমতা, অঢেল সম্পদ আর সামাজিক মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে অন্ধ হয়ে ছুটছে। ফলে চারদিকে শুধু প্রতিযোগিতা, অশান্তি আর সংঘাত। বিশ্বনেতারা শান্তি ফিরিয়ে আনতে বড় বড় চুক্তি করছেন, সীমানা নির্ধারণ করছেন, অর্থনৈতিক জোট গড়ছেন। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। কারণ, তারা সমস্যার আসল গোড়ায় হাত দিচ্ছেন না। আসলে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগের মূল কারণটি জানেন না। আর সেই কারণটি হলো, মানুষের ভেতরে মর্যাদা, সম্মান আর প্রশংসা পাওয়ার মোহ।

ঠিক চৌদ্দ শ বছর আগে, পবিত্র আল-কোরআনের একেবারে শুরুতে একটি বৈপ্লবিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সব প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর)। এটি কেবল মুখে আওড়ানোর কোনো সাধারণ মন্ত্র নয়। ইসলামের মুল দর্শন বলে, সৃষ্টিকর্তা সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ, মানুষের প্রশংসায় তার কোনো লাভ-ক্ষতি নেই। তা হলে এই শব্দের কাজ কী? কেন বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ আমাদের এই শব্দটি বারবার উচ্চারণ আর সেই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে অনুভব করতে বললেন? আসলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ হলো মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের একটি মাস্টার-পিস। খাবার খেলে যেমন দেহে পুষ্টি হয়, তেমনি মনের গঠনে মূল পুষ্টি রয়েছে এই শব্দের অনুভবে। এটি মানুষের অহংকার ভেঙে সমাজে সত্যিকার সাম্য তৈরি করার এক অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার। ইসলামের আবির্ভাবের আগে মক্কার সমাজ কেমন ছিল, তা দেখলে এই শব্দের শক্তি বোঝা যায়। মক্কার কুরাইশ বংশের নেতারা কিন্তু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত যে আল্লাহই সব সৃষ্টি করেছেন। তা হলে তারা ইসলামের বিরোধিতা করল কেন?

কারণ তারা মর্যাদা, সম্মান আর প্রশংসা খুব ভালোবাসত; তাই সমাজে নিজেদের কৃত্রিম ক্ষমতা ও শাসন টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তারা চাইত সাধারণ মানুষ তাদের পূজা করুক, তাদের দাস হয়ে থাকুক। আসলে মানুষের স্বভাবই এমন, সে সম্পদ আর ক্ষমতা খাটিয়ে অন্য মানুষের ওপর আধিপত্য জমাতে চায়। যখন ইসলাম এসে ঘোষণা করল যে সব বড়ত্ব, সব প্রশংসা আর সব সম্মান কেবল আল্লাহর; তখন মক্কার শাসকদের অহংকারে বড় একটা ধাক্কা লাগল। তারা বুঝতে পারল, এই দর্শন মেনে নিলে তাদের রাজমুকুট, বংশীয় মর্যাদা আর ক্ষমতার দাপট ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, মনিব আর ক্রীতদাসÑ সবাই এক সমান হয়ে গেল। সবাই হয়ে গেল এক প্রভুর গোলাম।

এই সমতার দর্শনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন স্বয়ং মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)। এত বড় আধ্যাত্মিক, সামরিক ও রাষ্ট্রীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি একদম সাধারণ জীবনযাপন করতেন। কোনো রাজপ্রাসাদ বা বিলাসিতা তার ছিল না। তিনি যখন কোথাও যেতেন, তখন তার সম্মানে কেউ দাঁড়াতে চেষ্টা করলে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। তিনি বলতেন এবং পালন করে দেখাতেন যে তিনি আর সব মানুষের মতোই আল্লাহর ভৃত্য, আল্লাহর গোলাম, আল্লাহর দাস। তিনি নিজেকে সবসময় আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দা হিসেবেই দেখতেন।

কীভাবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বিশ্বশান্তির মূল সূত্র : পৃথিবীর সব যুদ্ধ, অন্যায়, প্রতিযোগিতা, অত্যাচার আর শোষণের পেছনে একটাই কারণ, মানুষ অন্যের চেয়ে বড় হতে চায়, মানুষ মর্যাদা, সম্মান আর প্রশংসা পেতে মরিয়া। স্বৈরাচারী শাসক আর লোভী ব্যবসায়ীরা অন্যকে ঠকায়, কারণ তাদের ভ্রান্ত মর্যাদাবোধ অন্যের দাসত্ব দাবি করে। কিন্তু যখন মানুষেরা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এই শব্দটি দিনে ও রাতে বারবার অনুভব করে তখন এই শব্দটির ভেতরের দর্শন সমাজে মূলত তিনটি বড় পরিবর্তন আনে।

এক : আমি রাজা হতে চাই, আমি ধনী হতে চাই, আমি সুন্দর বাড়ি বানাতে চাই, কিন্তু কেন আমি সেটা চাই? আসলে আমি মানুষের থেকে প্রশংসা আর মর্যাদা পেতে চাই। কিন্তু যখন বিশ্বাস করা হয় যে আসল প্রশংসার যোগ্য কোনো মানুষ নয়, কোনো বস্তু নয়, মর্যাদা আর প্রশংসা কেবল আল্লাহর; তখন মানুষের ভেতরের অহংকার আর ডালপালা মেলতে পারে না। কোনো মানুষেরই অন্যদের ওপর জুলুম করার অধিকার থাকে না। মানুষ অহংকার ছেড়ে বিনয়ী হতে শেখে।

দুই : আজকের পুঁজিবাদী সমাজে যেমন ধনী-দরিদ্রের বিশাল বৈষম্য, মক্কাতেও তেমন ছিল। কিন্তু যখন একজন দেশের প্রধান এবং একজন সাধারণ দিনমজুর নামাজে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, তখন তারা স্বীকার করে নেয় যে, সহজাতভাবে কেউ কারো চেয়ে উঁচু কিংবা নিচু নয়। শাসকের ক্ষমতা কোনো অহংকারের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বড় দায়িত্ব বা আমানত। গরিবের অভাব তাকে অন্যদের থেকে ছোট করে না, বরং সেটা তার পরীক্ষার অংশ। এই চিন্তাটি সমাজ থেকে ‘প্রভু-দাস’ মানসিকতা দূর করে সাম্যের শক্তিকে মজবুত করে। তখন সেখানে কেউ রাজা, মহারাজা কিংবা মহাধনী, মহাজন হওয়ার প্রতিযোগিতা করে না। আর এমন হলেই কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তিন : আজকের দুনিয়ায় মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য টাকা জমায় না; বরং সম্পদ দিয়ে ক্ষমতা, খাতির আর মানুষের বাহবা কিনতে চায়। তারা সেলিব্রেটি হতে চায়, তারা বহুমূল্য ডায়মন্ড আর গোল্ড দিয়ে নিজের চেহারাকে প্রশংসিত করার জন্য জীবন দিয়ে দেয়। কিন্তু ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মন থেকে বিশ্বাস করলে মানুষ বোঝে যে, তার সম্পদ নিজের যোগ্যতায় আসেনি, এটি ওপরওয়ালার দেওয়া একটি উপহার বা আমানত মাত্র। মানুষ বুঝতে পারে সেলিব্রেটি হয়ে কোনো লাভ নেই কারণ এতে কোনো প্রশংসা নেই। সব প্রশংসা, মর্যাদা, সম্মান কেবল আল্লাহর জন্য। এমন অনুভবের চর্চা মানুষের আচরণে লোভ, প্রতিযোগিতা ও শোষণের বদলে দয়া ও দানের মানসিকতা তৈরি করে।

অশান্ত মন নিয়ে কখনো শান্তিময় পৃথিবী গড়া সম্ভব নয়। আজকের মানুষ সামাজিক মর্যাদা, করপোরেট ইঁদুরদৌড় আর সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক-কমেন্টের পেছনে ছুটে প্রতিনিয়ত মানসিক অশান্তি আর ডিপ্রেশনে ভুগছে। তারা সম্মান চাইছে, মর্যাদা চাইছে, স্ট্যাটাস চাইছে, প্রশংসা চাইছে, কিন্তু ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মানুষের মনকে এই ক্লান্তিকর প্রতিযোগিতা থেকে মুক্তি দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে, মানুষের দেওয়া সম্মান, মর্যাদা বা প্রশংসা অর্থহীন, আসল শান্তি লুকিয়ে আছে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির মধ্যে। এই জগতে কোনো মানুষের কাছে অন্য মানুষের কোনো মর্যাদা, সম্মান, প্রশংসা রাখা হয়নি। তবে মানুষের যেটুকু মর্যাদা তা রয়েছে কেবল স্বয়ং আল্লাহর কাছে অন্য কারো কাছে নয়। যে মন আল্লাহর ওপর ভরসা করে তৃপ্ত থাকে, তার মনে কোনো লোভ বা হিংসা থাকে না। আর এই লোভহীন মনই পারে পৃথিবীতে যুদ্ধ ও সংঘাত থামাতে। আজকের আধুনিক সমাজ এবং বিশেষ করে মুসলিম ভাইবোনদের জন্য বড় প্রশ্ন এটাই, আমরা কি কেবল মুখেই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলছি, নাকি এর ভেতরের আসল বৈপ্লবিক দর্শনকে জীবনে ধারণ করে নিজের অন্তরকে নতুন শক্তিতে সৃষ্টি করতে সাহস রাখছি?

(লেখক : মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক)

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!