পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের জন্য ত্যাগ, আনন্দ, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার উৎসব। প্রতি বছর এই সময় পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলনমেলা, কোরবানি ও সামাজিক সম্প্রীতির আবহে দেশজুড়ে এক ভিন্ন অনুভূতির জন্ম হয়। কিন্তু এ বছরের ঈদ সেই পরিচিত আনন্দের চিত্রকে ম্লান করে দিয়েছে একের পর এক শিশুমৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনায়। যখন ঘরে ঘরে কোরবানির প্রস্তুতি চলছিল, তখন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্তানের জীবন বাঁচাতে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন অসংখ্য মা-বাবা। অনেকেই ফিরেছেন শূন্য হাতে। ফলে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে গেছে শোক, আতঙ্ক ও গভীর অনিশ্চয়তা। রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একই ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি আধুনিক হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে একসঙ্গে এতগুলো নবজাতকের মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন হলেও ঘটনাটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। হাসপাতালের পরিবেশ, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা, রোগী পর্যবেক্ষণ, জরুরি সাড়াদান প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক তদারকির বিষয়ে যে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। একটি শিশুর মৃত্যু যেমন একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, তেমনি একইসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় ব্যর্থতার প্রতীক।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই হাসপাতাল-দুর্ঘটনার পাশাপাশি দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব অব্যাহত রয়েছে। ঈদের ছুটির মাত্র সাত দিনে ৫৭ শিশুর মৃত্যু এবং হাজার হাজার শিশুর আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিপজ্জনক সংকেত। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের সক্ষমতা, টিকাদান কার্যক্রমের বিস্তার, রোগ শনাক্তকরণ এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। হাম এমন কোনো নতুন রোগ নয়, যার প্রতিকার বা প্রতিরোধ পদ্ধতি অজানা। বিশ্বের বহু দেশ টিকাদানের মাধ্যমে এই রোগকে প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সেখানে বাংলাদেশে শত শত শিশুর মৃত্যু নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং বেদনাদায়ক।
কোরবানির দিন মাংস গলায় আটকে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও আমাদের আরেকটি বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জরুরি চিকিৎসা-সচেতনতার অভাব অনেক সময় এমন মৃত্যু ডেকে আনে, যা সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। স্কুল, কমিউনিটি ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা এখানেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে এ বছরের ঈদ আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে। একটি সমাজ কতটা নিরাপদ, তা কেবল তার সড়ক, ভবন বা অর্থনীতির উন্নয়ন দিয়ে বিচার করা যায় না, বিচার করতে হয় শিশুদের নিরাপত্তা দিয়ে। যদি একটি হাসপাতাল নবজাতকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, যদি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটে, যদি অভিভাবকরা সন্তানের জীবন নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন, তবে উন্নয়নের বহু দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন নয়; এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
আমরা মনে করি, হাসপাতালগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, জরুরি সেবা পরিচালনা, চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ এবং নিয়মিত পরিদর্শনকে আরও কঠোর করতে হবে। একইসঙ্গে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করে হামসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যে সমাজে উৎসবের দিনেও হাসপাতালের করিডরে সন্তানের জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বসে থাকতে হয়, যে সমাজে অসংখ্য পরিবার শিশুহারা হয়ে উৎসব পালন করে, সেখানে আনন্দের পূর্ণতা আসে না।
শিশুরা কোনো পরিসংখ্যান নয়। তারা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের জীবন রক্ষার প্রশ্নে অবহেলা, গাফিলতি কিংবা দায়িত্বহীনতার কোনো ক্ষমা নেই। ক্ষমা করা ঠিক হবে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন