মৌলভীবাজারের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের কর্ম, সৃজনশীলতা ও মানবিক অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। শেখ নুরুল ইকবাল ছিলেন তেমনই এক বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন শিক্ষক, ছড়াকার, কবি, সাহিত্যিক, ইসলামি গজল রচয়িতা, নাট্যাভিনেতা এবং স্বশিক্ষায় গড়ে ওঠা একজন অসাধারণ স্থাপত্য নকশাবিদ। জ্ঞান, সৃজনশীলতা, মানবসেবা ও বিনয়ী জীবনাচারের এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল তার জীবন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
শেখ নুরুল ইকবাল ১৯৫২ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালীন সিলেট জেলার মৌলভীবাজার মহকুমা, আজকের মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার মিরপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব মিয়া ২৮ মৌজার একজন সুপরিচিত সালিশ বিচারক ছিলেন। ন্যায়পরায়ণতা, প্রজ্ঞা ও সমাজসেবার জন্য তিনি সর্বমহলে সম্মানিত ছিলেন। মাতা ফুলজাহান বেগম ছিলেন একজন স্নেহময়ী গৃহিণী। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পারিবারিক পরিবেশেই শেখ নুরুল ইকবাল সততা, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা ও মানবকল্যাণের শিক্ষা লাভ করেন।
শিক্ষাজীবন
তার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় কাজিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন করেন। পরবর্তীতে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। একই কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে তিনি বিএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও কৃতকার্য হতে পারেননি। কিন্তু কোনো একাডেমিক সীমাবদ্ধতাই তার জ্ঞানান্বেষণ, আত্মশিক্ষা ও সৃজনশীল সাধনাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
শিক্ষকতা ও শিক্ষাসেবা
১৯৮০ সালে তিনি খালিশপুর দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা তার কাছে শুধু একটি পেশা ছিল না; বরং ছিল মানুষ গড়ার এক মহৎ দায়িত্ব। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপন করেছেন। তার আন্তরিকতা, স্নেহ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন তাকে ছাত্র, সহকর্মী ও সমাজের কাছে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা
শেখ নুরুল ইকবাল ছিলেন একজন স্বভাবকবি ও জনপ্রিয় ছড়াকার। কথায় কথায় ছড়া রচনা করা ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি ছড়া লিখতেন এবং ষাটের দশকেই সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছড়া ও কবিতা নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
মাসিক পরোয়ানা ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন সাহিত্যপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। ইসলামি গজল, কবিতা ও ছড়া রচনায় তিনি বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। তার রচিত বহু ইসলামি গজল শিল্পীদের কণ্ঠে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং অনেক শিল্পী তার গানের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন।
তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘একটি দেশের গল্প’, ‘মাতৃভাষা’, ‘সম্প্রীতি’, ‘প্রার্থনা’, ‘জীবনের হিসাব’, ‘পুণ্যভূমি’, ‘আমরা সিলটি রে ও ভাই’, ‘নারী-১’, ‘নারী-২’, ‘নেতা সমাচার’, ‘না’ত-এ-রাসুল (সা.)’ এবং ‘ওগো মদিনাওয়ালা’। এসব রচনায় দেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলনের চেতনা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিকতা, সিলেটের লোকজ ঐতিহ্য এবং সমকালীন সমাজবাস্তবতার গভীর প্রতিফলন ঘটেছে।
তার সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অত্যন্ত সহজ, সাবলীল ও লোকজ ভাষায় গভীর জীবনবোধ, ধর্মীয় অনুভূতি এবং সামাজিক বার্তা তুলে ধরা। কথায় কথায় ছড়া রচনা করার সহজাত ক্ষমতা তাকে মৌলভীবাজারের সাহিত্য অঙ্গনে এক স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
মৌলভীবাজারের প্রতিষ্ঠিত ছড়াকার ও সাংবাদিক আবদুল হামিদ মাহবুবের মতে, শেখ নুরুল ইকবালই ছিলেন মৌলভীবাজার মহকুমার প্রথম ছড়াকার। পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি নিয়মিত ছড়া রচনা করে স্থানীয় সাহিত্যাঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছিলেন।
সত্তরের দশকে তিনি সপ্তডিঙ্গা নামে একটি সাহিত্য ম্যাগাজিন সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন, যা সে সময়ের নবীন সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করা এবং স্থানীয় সাহিত্যাঙ্গনে সৃজনশীল চর্চার ক্ষেত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
পরবর্তীকালে মাসিক পরোয়ানাসহ বিভিন্ন সাহিত্যপত্র ও সংকলনে তার ছড়া, কবিতা ও গজল প্রকাশিত হয়। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রচারবিমুখ।
পুলক কান্তি ধর ও আজিজুল আম্বিয়া সম্পাদিত ‘দাঁড়াও সমূহ বিষাদ’, পুলক কান্তি ধর সম্পাদিত ‘কখনো পাহাড় কখনো নদী’ এবং পুলক কান্তি ধর ও কাজল রশীদ সম্পাদিত ‘কাব্যস্নান’ গ্রন্থেও তার রচিত ছড়া স্থান পেয়েছে।
তার সাহিত্যকর্মে দেশপ্রেম, মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় চেতনা, লোকজ জীবন ও জীবনদর্শনের গভীর প্রকাশ ঘটেছে।
সংস্কৃতিচর্চার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তার অভিনয়প্রতিভা। ১৯৭২ সালে সিরাজুল ইসলাম সিদ্দিকী রচিত একটি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি তার শিল্পীসত্তার পরিচয় তুলে ধরেন।
স্থাপত্য নকশায় অনন্য অবদান
শেখ নুরুল ইকবালের বহুমুখী প্রতিভার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল স্থাপত্য নকশায় তার অসাধারণ দক্ষতা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্য শিক্ষা ছাড়াই তিনি নিজস্ব মেধা, পর্যবেক্ষণশক্তি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে একজন দক্ষ নকশাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
মিরপুর জামে মসজিদের নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে তার স্থাপত্যযাত্রার সূচনা হয়। পরবর্তীতে তিনি দুই শতাধিক মসজিদ, একাধিক মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য বাসা-বাড়ির নকশা প্রণয়ন করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নকশা তৈরির বিনিময়ে তিনি কখনো কোনো অর্থ গ্রহণ করেননি। মানুষের কল্যাণ, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অবদান রাখা এবং সৃষ্টিশীল কর্মে আত্মতৃপ্তি লাভ করাই ছিল তার কাজের প্রধান প্রেরণা। এ ছাড়া তিনি মিরপুর নুরুল ইসলাম আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
পারিবারিক জীবন
১৯৮২ সালে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার রায়শ্রী গ্রামের সৈয়দ ইলিয়াছ মিয়া ও জাহানারা বেগমের তৃতীয় কন্যা সৈয়দা নাসিমা বেগম এর সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারজীবন ছিল ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধে পরিপূর্ণ।
তিনি দুই পুত্র ও চার কন্যার জনক। তার সব সন্তান বিবাহিত এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তার সন্তানদের মধ্যে তাবাস্সুম ফেরদৌস সামান্তা ও মিজানুর রহমান মিজান দেশে অবস্থান করছেন; অপর তিন কন্যা ও এক পুত্র যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যানসারে ভোগার পর ২০২৬ সালের ১৯ মে, মঙ্গলবার রাত ৯টা ২০ মিনিটে মৌলভীবাজার শহরের ইনসানিয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে মৌলভীবাজারের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার কর্ম, চিন্তা, সৃষ্টিশীলতা ও মানবিক আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। শিক্ষক হিসেবে তিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন, সাহিত্যিক হিসেবে মানুষের অনুভূতিকে শব্দে রূপ দিয়েছেন এবং স্থাপত্য নকশাবিদ হিসেবে রেখে গেছেন অসংখ্য স্থায়ী নিদর্শন। মৌলভীবাজারের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাসে শেখ নুরুল ইকবালের নাম একজন নীরব সাধক, সৃজনশীল মনীষী ও মানবকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন