প্রতিবার বর্ষা এলেই একই দৃশ্য, একই দুর্ভোগ, একই প্রতিশ্রুতি। কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের বড় শহরগুলোর সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি। কর্মজীবী মানুষ কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে নগরজীবন। দোকানপাট, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়। অথচ এ দুর্ভোগ যেন আমাদের নগরজীবনের অবধারিত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু অতিবৃষ্টির ফল নয়, এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীক। বছরের পর বছর উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই যদি একটি শহর অচল হয়ে পড়ে, তবে সেই উন্নয়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
নগর পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলোÑ প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ ধ্বংস করা। একসময় যে খালগুলো বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে নিয়ে যেত, তার অধিকাংশই আজ দখল, ভরাট কিংবা অব্যবস্থাপনার শিকার। জলাভূমি বিলীন হয়েছে, নিচু জায়গা কংক্রিটে ঢেকে গেছে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প ও বহুতল ভবন। ফলে পানি যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়েছে, কিন্তু পানি জমার জায়গা বেড়েছে। অন্যদিকে অপর্যাপ্ত ও অযতেœ থাকা ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
এ বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর বর্ষার আগেই ড্রেন পরিষ্কার, খাল পুনরুদ্ধার ও জলাবদ্ধতা নিরসনের নানা ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তার সুফল মানুষ কেন পায় না? কোথায় সেই প্রকল্পগুলোর জবাবদিহি? কোথায় ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের কার্যকারিতা? জনগণের করের অর্থ ব্যয় করে যদি নাগরিকদের ন্যূনতম চলাচলের নিশ্চয়তাও দেওয়া না যায়, তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
জলাবদ্ধতা কেবল নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে না, এটি অর্থনীতিকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে, পরিবহন ব্যাহত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থির পানিতে মশার বিস্তার ঘটে, বাড়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি। অর্থাৎ একটি অব্যবস্থাপনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং নগর নিরাপত্তার প্রতিটি ক্ষেত্রে।
এ অবস্থার পরিবর্তনে আর খ-িত উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। নগরের প্রতিটি খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দ্রুত দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধার করতে হবে। সরকারকে এ সমস্যাকে কেবল বর্ষাকালের সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। জলাবদ্ধতা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত একটি জাতীয় নগর-নিরাপত্তা ইস্যু। তাই সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সংস্থা, নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে এবং ব্যর্থতার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
নাগরিকদের দায়িত্বও কম নয়। যত্রতত্র পলিথিন ও বর্জ্য ফেলে ড্রেন বন্ধ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, নাগরিক সচেতনতা কখনোই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বিকল্প হতে পারে না।
প্রতি বর্ষায় মানুষ একই দুর্ভোগে পড়বে, আর কর্তৃপক্ষ একই ব্যাখ্যা দেবে, এ চক্র আর চলতে পারে না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদ- কেবল উড়ালসেতু, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নয়, উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেও একটি শহরের স্বাভাবিক জীবন থেমে থাকবে না। সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন